ভারতের রাজধানী দিল্লির মালবীয় নগর এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন। বুধবার সকালে হাউজ রানি এলাকার একটি পাঁচতলা ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ হোটেলে আগুন লাগার পর দ্রুত তা পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটে।
এই অগ্নিকাণ্ড দিল্লির হোটেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি বাস্তবায়নের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিহত ২১ জনের মধ্যে ১৮ জনই বিদেশি নাগরিক। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, লাইবেরিয়া এবং আফগানিস্তানের নাগরিক থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোন দেশের কতজন নাগরিক নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে আহত অন্তত ১৭ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে আহত পাঁচ বাংলাদেশি নাগরিক বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ম্যাক্স হাসপাতাল এবং অন্যদের সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ হাই কমিশন সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। একই সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহত ও আহত বিদেশিদের বেশিরভাগই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। ভারতের বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য তারা ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের নিরাপদ আবাসনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি দুর্ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই দমকল বাহিনী, পুলিশ এবং উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের বের করে আনতে গিয়ে প্রায় ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
উদ্ধারকারীরা জানান, ভবনের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। অনেককে জানালা ও সিঁড়ি ব্যবহার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার পরপরই অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা ধরনের তথ্য সামনে আসে। প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ফলে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। পাশাপাশি পাশের ‘লেমন গ্রিন’ রেস্তোরাঁ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছিল।
তবে তদন্তের অগ্রগতিতে পুলিশ জানিয়েছে, আগুনের উৎপত্তি হোটেল ভবনের ভেতরেই হয়েছে। বর্তমানে তদন্তকারীরা বিদ্যুতের শর্ট সার্কিটকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন।
চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তদন্তে আরও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হোটেলটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল মাত্র ছয়টি কক্ষ পরিচালনার জন্য। কিন্তু বাস্তবে সেখানে প্রায় ২৫টি কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছিল।
এই অনিয়মের ফলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং ভবনের ধারণক্ষমতা সংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত কক্ষ পরিচালনা করলে জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ভারতের বিভিন্ন শহরে আবাসিক হোটেল এবং অতিথিশালাগুলোতে অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র, জরুরি নির্গমন পথ কিংবা নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শনের অভাব দেখা যায়।
দিল্লির সাম্প্রতিক এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করলে তার ভয়াবহ পরিণতি কতটা মারাত্মক হতে পারে।
ঘটনার পর হোটেলটির লাইসেন্স, ভবন অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা সনদ এবং অন্যান্য আইনগত নথিপত্র যাচাই শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে রাজধানীর অন্যান্য আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউসেও নিরাপত্তা পরিদর্শন জোরদারের দাবি উঠেছে।
দিল্লির মালবীয় নগরের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি করুণ উদাহরণ। এতে বহু পরিবারের স্বপ্ন ও জীবন মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। আহত পাঁচ বাংলাদেশির দ্রুত সুস্থতা কামনার পাশাপাশি এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তা মান কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি ছাড়া এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়।

