বিজ্ঞান যেন ধীরে ধীরে কল্পবিজ্ঞানের সীমা ছুঁতে শুরু করেছে। প্রায় ৫০০ বছর আগে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া এক বিশালাকার পাখিকে ফের জীবিত করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে বিজ্ঞানীরা। আর সেই লক্ষ্য পূরণের পথে বড় সাফল্য পেল একটি মার্কিন গবেষণা সংস্থা। গবেষণাগারে তৈরি কৃত্রিম ডিম ফুটে একসঙ্গে জন্ম নিয়েছে ২৪টি মুরগির ছানা।
শুনতে অবাক লাগলেও, এই কৃত্রিম ডিম কোনও মুরগি পাড়েনি। সম্পূর্ণ গবেষণাগারে তৈরি হয়েছে সেটি। তবে ডিম কৃত্রিম হলেও, তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ছানাগুলি সম্পূর্ণ জীবন্ত এবং স্বাভাবিক।
কেন তৈরি করা হল এই কৃত্রিম ডিম?
এই গবেষণার লক্ষ্য মুরগির খামারে বিপ্লব আনা নয়। বরং বিজ্ঞানীদের আসল উদ্দেশ্য অনেক বড়। তাঁরা চেষ্টা করছেন বহু শতাব্দী আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে।
এই প্রকল্পের কেন্দ্রে রয়েছে জায়ান্ট মোয়া নামে এক বিশালাকার পাখি। প্রায় ৫০০ বছর আগে নিউজিল্যান্ড-এ এই পাখির অস্তিত্ব ছিল। আকারে অত্যন্ত বড় হলেও এই পাখিরা উড়তে পারত না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শিকার এবং মানুষের হস্তক্ষেপের কারণেই ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় জায়ান্ট মোয়া।
প্রাচীন ডিএনএ থেকে ফিরবে হারানো প্রাণী?
বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা হল, প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করে সেই বিলুপ্ত প্রাণীদের জিনগত বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করা। তারপর আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেই প্রাণীদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।
এই কারণেই কৃত্রিম ডিম তৈরি করে তার ভিতরে ভ্রূণের বিকাশ ঘটানোর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে গবেষকরা। ২৪টি মুরগির ছানার সফল জন্ম সেই পরীক্ষারই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে মনে করা হচ্ছে।
কোন সংস্থা করছে এই গবেষণা?
এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পের পিছনে রয়েছে মার্কিন বায়োটেক সংস্থা Colossal Biosciences। টেক্সাস-ভিত্তিক এই সংস্থা ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে এসেছে তাদের অভিনব গবেষণার জন্য।
সংস্থার লক্ষ্য শুধু জায়ান্ট মোয়া নয়, আরও কয়েকটি বিলুপ্ত প্রাণীকেও পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।
ডোডো পাখিকেও ফেরানোর পরিকল্পনা
জায়ান্ট মোয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন ডোডো পাখিকে ফিরিয়ে আনার জন্যও।
একসময় মরিশাস দ্বীপে দেখা যেত এই পাখিকে। মানুষের অত্যধিক শিকার এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ডোডোও পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের আশা, উন্নত জিনপ্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতে এই পাখিকেও আবার জীবিত করা সম্ভব হতে পারে।
আগেও চমকে দিয়েছিল এই সংস্থা
গত বছরও এই সংস্থা বিশ্বজুড়ে চর্চায় আসে। কারণ তারা দাবি করেছিল, তুষার যুগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডায়ার উলফ-এর জিনগত বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনে তারা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে।
এই ধরনের গবেষণাকে বলা হয় “ডি-এক্সটিঙ্কশন” বা বিলুপ্ত প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার বিজ্ঞান।
কী ভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?
বিজ্ঞানীরা প্রথমে বিলুপ্ত প্রাণীর সংরক্ষিত ডিএনএ সংগ্রহ করেন। সেই ডিএনএ বিশ্লেষণ করে তার জিনগত গঠন বোঝার চেষ্টা করা হয়। তারপর আধুনিক প্রাণীর কোষের সঙ্গে সেই জিনগত বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে নতুন ভ্রূণ তৈরির চেষ্টা করা হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় অত্যাধুনিক জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
বিজ্ঞানীদের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?
যদিও এই গবেষণা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, তবু বিজ্ঞানীদের সামনে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
- বহু প্রাচীন ডিএনএ প্রায়শই ক্ষতিগ্রস্ত থাকে
- সম্পূর্ণ জিনগত গঠন পুনর্নির্মাণ করা কঠিন
- জীবিত প্রাণীতে সেই বৈশিষ্ট্য সফলভাবে তৈরি করাও বড় চ্যালেঞ্জ
- পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রশ্নও রয়েছে
অনেক বিশেষজ্ঞ আবার প্রশ্ন তুলছেন, বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনা আদৌ কতটা নিরাপদ হবে।
বিজ্ঞান না কল্পবিজ্ঞান?
একসময় যেটা শুধুই সিনেমা বা গল্পের বিষয় ছিল, এখন সেটাই ধীরে ধীরে বাস্তবের কাছাকাছি পৌঁছচ্ছে। কৃত্রিম ডিম থেকে সফল ভাবে ছানার জন্ম সেই সম্ভাবনাকেই আরও জোরালো করেছে।
যদিও জায়ান্ট মোয়া বা ডোডোকে সত্যিই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা এখনও অনেক দূরের পথ, তবু এই সাফল্য বিজ্ঞানীদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।

