ইসলামী ব্যাংক, শেয়ার মালিকানা ও রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, কোনো ব্যাংক, রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যক্তিকে ইসলামের সঙ্গে একাকার করে দেখানো উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলাম নন এবং জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। ধর্মকে রাজনৈতিক বা আর্থিক বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করার আহ্বান জানান তিনি।
মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশনের তৃতীয় দিনে ৬৮ বিধিতে উত্থাপিত ইসলামী ব্যাংক সংক্রান্ত একটি নোটিশের জবাব দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে নোটিশটি উত্থাপন করেছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা একটি আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। তিনি জানান, ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো, শেয়ার অধিগ্রহণ এবং পরিচালনা ব্যবস্থার বিষয়ে যদি কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে কিছু শেয়ার অন্যায়ভাবে বা ‘ডাকাতির মাধ্যমে’ কেনা হয়েছে। এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থাগুলোর। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইবনে সিনার শেয়ার লেনদেনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্লক মার্কেটে একটি শেয়ার স্বাভাবিক মূল্যের প্রায় তিন গুণ দামে বিক্রি হওয়ার ঘটনা রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের ঘটনা দেশের পুঁজিবাজারে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয় এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
তার মতে, শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন কিংবা মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনা নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং জনগণ প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে অবগত হতে পারবেন।
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ও দাবি-দাওয়া সামনে আসছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনুমাননির্ভর বক্তব্যের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। তিনি অর্থমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতি এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানান।
তার মতে, প্রকৃত মালিকানা, শেয়ারের পরিমাণ এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হলে বিভ্রান্তি কমবে এবং অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিতর্কও প্রশমিত হবে।
সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেটি একটি পৃথক তদন্তের বিষয়। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত হতে পারে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, একটি পাবলিক লিস্টেড কোম্পানির শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো এবং শেয়ার কেনার পদ্ধতি এক বিষয় নয়। উভয় ক্ষেত্রকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু মহল বিষয়টিকে ধর্মীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে “ইসলামের ওপর হাত দেওয়া হচ্ছে” ধরনের বক্তব্য জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামী ব্যাংক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আর রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক সংগঠন। এগুলোর কোনোটি ইসলামের প্রতীক নয়। ফলে কোনো ব্যাংক বা রাজনৈতিক দলের সমালোচনা মানেই ইসলামের বিরোধিতা নয়।
মন্ত্রী বলেন, ধর্মকে রাজনৈতিক সুরক্ষা হিসেবে ব্যবহার করা হলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, শেয়ার মালিকানা বা ঋণ বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেগুলোর উত্তর তথ্য ও তদন্তের মাধ্যমেই খুঁজে বের করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের যথেষ্ট আইনগত ক্ষমতা রয়েছে। কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, বাতিল কিংবা বিশেষ প্রশাসনিক তদারকির মতো পদক্ষেপও নেওয়া সম্ভব। তাই ইসলামী ব্যাংক সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত।
বক্তব্যের শেষাংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, অতীতে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন প্রকল্প ও ঋণ বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নতুন করে ইসলামী ব্যাংক, শেয়ার মালিকানা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমারেখা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ধর্ম, রাজনীতি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এক কাতারে ফেলা উচিত নয়। ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, শেয়ার কাঠামো ও ঋণ কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর উত্তর তদন্ত ও তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক বিতর্কে ব্যবহার না করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

