জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও অভিযোজন কার্যক্রমে দেশের সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে

Share

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের ইতিহাসে জলবায়ু খাতে অন্যতম সর্বোচ্চ বরাদ্দ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার মতো বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তাই এই বড় বরাদ্দের মূল কারণ।

বাংলাদেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে খুবই সামান্য অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন হ্রাস, নিরাপদ পানির সংকট এবং জীবিকা হারানোর ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের প্রকোপও বেড়েছে। ফলে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগকে সময়ের দাবি হিসেবে দেখছে সরকার।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় হবে—

  • উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন ও মেরামত
  • বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প
  • নিরাপদ পানি সরবরাহ
  • বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন
  • কৃষিতে জলবায়ু অভিযোজন প্রযুক্তি
  • জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ

নীতিনির্ধারকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এখন শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে।

বড় বরাদ্দের মধ্যেও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গা হলো স্বাস্থ্য খাত। জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও এ খাতে বরাদ্দ কমছে।

গবেষণা অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২.৭৪ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেমে এসেছে ১.৯৭ শতাংশে। একই সময়ে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও প্রায় ২.৫ শতাংশ থেকে কমে ১.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বর্তমান বাস্তবতা।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাড়ছে হিটস্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য বাহকবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে বাড়ছে ডায়রিয়া, কলেরা ও পানিবাহিত রোগ। অন্যদিকে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ এবং গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকিও বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু উদ্বাস্তু বৃদ্ধির ফলে আগামী বছরগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের নারী ও কিশোরীরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকট, লবণাক্ততা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে প্রজনন স্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অংশগ্রহণকারী প্রায় অর্ধেক নারী অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং অন্যান্য প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া গর্ভপাত, প্রি-একলাম্পসিয়া, প্রসবকালীন জটিলতা ও প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণের হারও বেড়েছে। প্রায় ৮২.৫ শতাংশ নারী নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার অভাবকে স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি উন্নয়ন প্রকল্পনির্ভর হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। প্রকল্প শেষ হলে অনেক কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। এতে রোগ নজরদারি, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ৫২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অর্থ কীভাবে এবং কোথায় ব্যয় করা হচ্ছে তার ওপর।

যদি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা, জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা, রোগ নজরদারি জোরদার করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে এই বাজেট দেশের জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

অন্যথায়, ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দও কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকেই।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন