বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স খাতের জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট হতে পারে এক নতুন সম্ভাবনার সূচনা। সরকার তথ্যপ্রযুক্তি, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার এবং ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে ব্যাপক কর ও ভ্যাট সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, প্রস্তাবিত সুবিধাগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ফ্রিজ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
এ উদ্যোগ শুধু ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির বার্তা নয়, বরং দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাজেট-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, মনিটর এবং মোবাইল ফোনের ওপর বর্তমানে যে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা রয়েছে, তার মেয়াদ আরও কয়েক বছর বাড়ানোর বিষয়ে সরকার ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
এই সুবিধা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। ফলে বাজারে তুলনামূলক কম দামে প্রযুক্তিপণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার, আইটি পেশাজীবী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা এর সরাসরি সুফল পেতে পারেন।
প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে শুধু চূড়ান্ত পণ্যের ওপর নয়, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের ওপরও কর-সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, প্রিন্টার, মনিটর এবং ফ্ল্যাশ মেমোরি তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের আমদানি ব্যয় কমে গেলে উৎপাদন খরচও কমবে। এর ফলে স্থানীয় কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে পারবে।
দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদন শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে সরকার নতুন কর-সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, মোবাইল ফোন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে করহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন সংযোজন ও উৎপাদন করছে। নতুন কর-সুবিধা কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং বাজারে আরও সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এছাড়া প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তারা এই শিল্পে আগ্রহী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আসন্ন বাজেটের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি যাচ্ছে ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য উৎপাদন খাতে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যের ওপর ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হতে পারে।
ভ্যাট কমানোর ফলে উৎপাদকদের খরচ কমবে এবং বাজারে পণ্যের মূল্যও হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে সাধারণ ভোক্তারা উন্নতমানের গৃহস্থালি পণ্য আরও সাশ্রয়ী মূল্যে কিনতে পারবেন।
দেশীয় শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে সরকার ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক ও কর ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর চিন্তা করছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করবে। নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এ ধরনের নীতিগত ধারাবাহিকতা শিল্প উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে দেশে অন্তত ২২টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন করছে। এই খাতে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যায়।
সরকারের লক্ষ্য হলো, স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে একটি রফতানিমুখী ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য কর-সুবিধা, ভ্যাট ছাড় এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উৎপাদন ব্যয় কমলে দেশীয় কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনে আরও উৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে।
প্রস্তাবিত কর ও ভ্যাট সুবিধাগুলো কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন সাধারণ ভোক্তারা। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ফ্রিজ ও এসির মতো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমে এলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও সহজ হবে।
বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্র, অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল সেবার বিস্তারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রযুক্তিপণ্য সহজলভ্য হলে ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য বাস্তবায়নেও নতুন গতি আসবে।
আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতি, শিল্প, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ খাতে নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে এই বাজেটকে ঘিরে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স খাতে প্রস্তাবিত কর-সুবিধাগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স খাতের জন্য পরিকল্পিত কর ও ভ্যাট সুবিধা দেশের শিল্পায়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমে গেলে বাজারে মূল্য হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রযুক্তি শিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

