যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে ইরানকে ভবিষ্যতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ না দিতে চুক্তিতে আরও কঠোর শর্ত সংযোজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
রবিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান মিট দ্য প্রেস-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন এবং তেহরান এমন একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। একই সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন এবং তার ব্যক্তিগত সাহসিকতারও প্রশংসা করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইতোমধ্যে সমাধানের পথে রয়েছে। তিনি জানান, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার নীতিগত অঙ্গীকার করেছে। তবে বর্তমান খসড়া চুক্তিতে কিছু ফাঁকফোকর রয়ে গেছে বলে মনে করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প বলেন, বিদ্যমান ধারায় শুধুমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র “তৈরি না করার” বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তার মতে, ইরান যদি ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করে বা বিকল্প কোনো উপায়ে তা অর্জন করে, তাহলে সেই ঝুঁকি থেকেই যাবে। এ কারণেই তিনি চুক্তিতে অতিরিক্ত ভাষা যুক্ত করতে চান, যাতে ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, ক্রয় কিংবা অন্য কোনোভাবে অর্জন—সব পথই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের স্পষ্ট ও বিস্তৃত বিধিনিষেধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে দূরে রাখা। ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই তেহরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি মনে করেন, শুধু অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; অস্ত্র সংগ্রহের সব সম্ভাব্য পথও বন্ধ করতে হবে। এ কারণেই আলোচনায় নতুন শর্ত সংযোজনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের নীতিরই ধারাবাহিকতা, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে দেখা হয়।
চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হলে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হতে পারে বলে জানান ট্রাম্প। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে সেই উপাদান ধ্বংস করে দেওয়া হবে যাতে ভবিষ্যতে তা সামরিক কাজে ব্যবহার করা না যায়।
তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে যদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পারমাণবিক উপাদান নিরাপদভাবে সরিয়ে নিয়ে ধ্বংস করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা উদ্বেগ অনেকাংশে কমে আসবে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে অন্যতম বড় পদক্ষেপ।
কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিলেও ট্রাম্প সামরিক বিকল্পের বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। বরং তিনি সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
তার ভাষায়, যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হতে পারে। প্রয়োজনে ইউরেনিয়ামের মজুত জব্দ করাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ধরনের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, অতীতে তিনি ইরানের ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম মজুত জব্দ করার জন্য সামরিক অভিযান পরিচালনার সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছিলেন। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সংঘাতের মাত্রা বিবেচনা করে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন।
তিনি জানান, বর্তমানে ইরানি প্রশাসন নিজস্ব ইউরেনিয়াম মজুতের ওপরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। ফলে তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে তিনি মনে করেন।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি অব্যাহত রাখার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তার মতে, আলোচনা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখা জরুরি।
ট্রাম্পের দাবি, চলমান সংঘাতের কারণে ইরানের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর দেশটির নেতৃত্বে আচরণগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বর্তমান নেতৃত্ব আগের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী ও কৌশলী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তেহরানকে নতুন করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে। ফলে আলোচনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে ঘিরে ট্রাম্পের মন্তব্য। তিনি দাবি করেন, চলমান যুদ্ধের মধ্যে খামেনি গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।
তবে একই সঙ্গে তিনি খামেনির সাহসিকতার প্রশংসা করেন। ট্রাম্প বলেন, এত গুরুতর অবস্থার মধ্যেও তিনি আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন, যা তার দৃঢ় মানসিকতার পরিচয় বহন করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, অনেক নেতা এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক আলোচনার পরিবর্তে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু খামেনি আলোচনার বিষয়ে আগ্রহ বজায় রেখেছেন, যা তাকে বিস্মিত করেছে।
মোজতবা খামেনি বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো তথ্য দিতে চাননি ট্রাম্প। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি যা জানেন তা প্রকাশ করতে আগ্রহী নন।
তবে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে তিনি জানান, খামেনির অবস্থান সম্পর্কে তার কাছে তথ্য থাকতে পারে। যদিও তিনি স্পষ্ট করে বলেননি যে ইরানের এই নেতা বর্তমানে দেশেই অবস্থান করছেন কি না।
এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলবে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
তবে চূড়ান্ত সমঝোতার আগে এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিষ্পত্তি হওয়া বাকি রয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহল এখন নজর রাখছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

