চাঁদিফাটা রোদ আর অসহনীয় গরমে কার্যত হাঁসফাঁস অবস্থা সাধারণ মানুষের। বাইরে কয়েক মিনিট থাকলেই শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। এই অতিরিক্ত গরম শুধু ক্লান্তিই ডেকে আনছে না, বাড়িয়ে দিচ্ছে গুরুতর অসুস্থতার আশঙ্কাও। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবল তাপমাত্রা এবং শরীরে জলশূন্যতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মস্তিষ্কে। আর সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে হিটস্ট্রোক এবং স্ট্রোকের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি।
অনেকেই মনে করেন স্ট্রোক শুধুমাত্র বয়স, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবিটিসের কারণে হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, অতিরিক্ত গরম এবং ডিহাইড্রেশনও মস্তিষ্কের উপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করতে পারে।
কী ভাবে গরম মস্তিষ্কের ক্ষতি করে?
মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শরীর ঘামের মাধ্যমে তাপ বাইরে বের করে দেয়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় থাকলে অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় জল এবং ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে শরীরে যদি পর্যাপ্ত তরল না পৌঁছয়, তা হলে শুরু হয় ডিহাইড্রেশন। শরীরে জল কমে গেলে রক্ত ধীরে ধীরে ঘন হতে শুরু করে। আর রক্ত ঘন হয়ে গেলে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলেই তৈরি হতে পারে ইস্কেমিক স্ট্রোক।
স্ট্রোকের সঙ্গে গরমের সম্পর্ক কোথায়?
সাধারণত স্ট্রোকের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, বয়স, ডায়াবিটিস বা হৃদ্রোগকে দায়ী করা হয়। তবে তীব্র গরমও রক্তনালি এবং হৃদ্যন্ত্রের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
গরমে শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য ধমনীগুলি প্রসারিত হয়। তখন হৃদ্পিণ্ডকে আরও বেশি পরিশ্রম করে শরীরে রক্ত সরবরাহ করতে হয়। ফলে কার্ডিয়োভাসকুলার সিস্টেমের উপর চাপ বাড়ে।
বিশেষ করে যাঁদের—
- উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে
- ডায়াবিটিস রয়েছে
- হৃদ্রোগ রয়েছে
- কোলেস্টেরল বেশি
- বয়স বেশি
তাঁদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
রক্তচাপ কমে গেলেও বাড়তে পারে বিপদ
চিকিৎসকদের মতে, ডিহাইড্রেশনের কারণে অনেক সময় হঠাৎ রক্তচাপ কমে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছতে পারে না। দীর্ঘ সময় এমন চললে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
এই কারণেই গরমে অনেকের মাথা ঘোরা, ঝাপসা দেখা বা আচমকা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
কোন লক্ষণগুলি একেবারেই অবহেলা করবেন না?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, হিটস্ট্রোক বা স্ট্রোকের প্রথম দিকের লক্ষণকে অনেকেই সাধারণ গরমের ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ এই উপসর্গগুলিই হতে পারে বড় বিপদের সতর্কবার্তা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের লক্ষণগুলি দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে—
- প্রবল মাথাব্যথা
- মাথা ঘোরা
- বমি ভাব
- শরীরের এক দিকে অসাড়তা
- কথা জড়িয়ে যাওয়া
- দুর্বলতা
- ঝাপসা দেখা
- অতিরিক্ত ঘাম বা শরীর গরম হয়ে যাওয়া
এই ধরনের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
চিকিৎসকদের মতে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গরমের প্রভাব অনেক বেশি মারাত্মক হতে পারে। যেমন—
- বয়স্ক মানুষ
- ছোট শিশু
- বাইরে কাজ করেন যাঁরা
- হৃদ্রোগী
- ডায়াবিটিস রোগী
- কিডনির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
এই সব মানুষের শরীর দ্রুত ডিহাইড্রেশনের শিকার হতে পারে।
কী ভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চললেই ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব।
বেশি করে জল পান করুন
শুধু তেষ্টা পেলেই নয়, নিয়মিত জল খেতে হবে। পাশাপাশি ওআরএস, ডাবের জল বা নুন-চিনির শরবত খেলে শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় থাকে।
দুপুরের রোদ এড়িয়ে চলুন
সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভাল। কারণ এই সময় সূর্যের তাপ সবচেয়ে বেশি থাকে।
হালকা খাবার খান
গরমে অতিরিক্ত তেলমশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে হালকা এবং সহজপাচ্য খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
শরীরের সংকেত বুঝুন
অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা হলে তা কখনও অবহেলা করবেন না। দ্রুত বিশ্রাম নিন এবং শরীরে তরল পৌঁছনোর ব্যবস্থা করুন।

