তোফায়েল আহমেদের শেষ বিদায়: বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক

Share

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসনের নয়বারের সাবেক সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদকে তার নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেলে ভোলার নিজ জন্মভূমিতে তৃতীয় ও শেষ জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তার স্মৃতিবিজড়িত বাড়ির সামনে শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নিতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ সমবেত হন। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধাভরে এই প্রবীণ নেতাকে শেষ বিদায় জানান।

জানাজা শেষে মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার বাবা আজাহার আলী, মা ফাতেমা খানম এবং স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, জীবদ্দশায় তিনি নিজেই এই স্থানে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

তোফায়েল আহমেদের জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে ভোলা সদর উপজেলায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ফলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
এর আগে দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে তোফায়েল আহমেদের মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টার ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শেষে ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবতরণ করে। সেখান থেকে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে ভোলা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নেওয়া হয়।

বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত প্রথম জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজার আগে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মরদেহ তার নিজ গ্রাম কোড়ালিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আরও দুটি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তোফায়েল আহমেদ। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি পক্ষাঘাতসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে সিসিইউ এবং পরবর্তীতে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। শেষ সময়ে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা, শুভানুধ্যায়ী এবং ভোলার সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।

জানাজায় অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দারা স্মৃতিচারণ করে বলেন, রাজনীতির বাইরেও তোফায়েল আহমেদ ছিলেন একজন সহজ-সরল ও জনবান্ধব মানুষ। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তারা বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে ভোলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতিতে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, জানাজায় অংশগ্রহণ এবং তার কবরে একমুঠো মাটি দিতে পেরে তারা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করছেন।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নেতৃত্বগুণের পরিচয় দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ছাত্ররাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হন।

রাজনৈতিক জীবনে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচরদের একজন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে তিনি মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সংসদ সদস্য হিসেবেও তিনি একাধিকবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি আবারও জনগণের আস্থা অর্জন করেন।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে ভোলাবাসী একজন অভিভাবকসুলভ নেতাকে হারাল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি জেলার মানুষের কাছে বিশেষভাবে সম্মানিত ছিলেন।

রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশের উন্নয়নে তার অবদান আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। বাবা-মায়ের কবরের পাশে তার শেষ শায়িত হওয়া যেন জন্মভূমির সঙ্গে তার আজীবনের সম্পর্কেরই এক প্রতীকী সমাপ্তি।

একজন ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মন্ত্রী এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ কর্মময় জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন