রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে মানবপাচারের অভিযোগ, পাটগ্রামের ৪ যুবকের সন্ধানে দিশেহারা পরিবার

Share

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে চার যুবককে রাশিয়ায় পাঠানোর পর তাদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জামায়াতের সহযোগী যুব সংগঠনের দুই নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। নিখোঁজ যুবকদের পরিবার এখন চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, পাটগ্রাম উপজেলা যুব বিভাগের সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি ইউনুস আলী এবং পৌর যুব বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মাহিন ইসলাম উচ্চ বেতনের গার্মেন্টস চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা করে নেন। পরে ঢাকা উত্তরার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তাদের রাশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এজেন্সি নিরাপদ ও বৈধ কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়েছিল। ভিসা, টিকিট ও চাকরির সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয় যুবকদের পরিবার থেকে।

চলতি মাসের ৪ তারিখে পাটগ্রাম সদর ইউনিয়নের টেপুরগাড়ী এলাকার নাজমুল হক সৌরভ, মেহেদী হাসান, সর্দারপাড়া এলাকার আল আমিন এবং আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বাড়ি থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়। এরপর ৭ মে তারা রাশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাহরাইন বিমানবন্দরে প্রায় ১২ ঘণ্টার ট্রানজিট শেষে তারা মস্কোর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পরদিন মস্কো পৌঁছানোর পর প্রথমদিকে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন তারা। কিন্তু এরপরই পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নেয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মস্কো বিমানবন্দর থেকে কয়েকজন রুশ সেনা সদস্য যুবকদের একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের পাসপোর্ট, ভিসা ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। তখনই তারা জানতে পারেন, চাকরির পরিবর্তে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এরপর থেকেই পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে অন্যের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজেদের বিপদের কথা জানায় তারা। ক্ষুদে বার্তায় জীবন বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধও করে।

নাজমুল হক সৌরভের বাবা দেলদার হোসেন বলেন, ছেলে বিদেশে ভালো চাকরি করবে—এই আশায় জমিজমা বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলেন। এখন জানতে পারছেন, তাকে সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। দিন-রাত ছেলের চিন্তায় পরিবারে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

মেহেদী হাসানের বাবা রাবিউল ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ছেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। ভালো চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে তাকে বিদেশে পাঠানো হলেও এখন সে কার্যত নিখোঁজ।

পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে ইউনুস ও মাহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা প্রথমে সবকিছু অস্বীকার করেন। তারা দাবি করেন, যুবকেরা নিরাপদে আছে এবং পরে ভিডিও কলে কথা বলবে। কিন্তু সময় গড়ানোর পরও যোগাযোগ না হওয়ায় পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়ে।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগী পরিবারের কয়েকজন সদস্য ঢাকার উত্তরায় সংশ্লিষ্ট এজেন্সির কার্যালয়ে যান। সেখানে প্রথমে কয়েক দিনের মধ্যে যুবকদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে গিয়ে দেখা যায় অফিস তালাবদ্ধ।

এই ঘটনার পর পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। তারা ধারণা করছেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের অংশ হতে পারে।

গত ২১ মে ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩০টি পরিবার মানববন্ধন করে। সেখানে পাটগ্রামের পরিবারগুলোও অংশ নেয়।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্বজনরা তাদের সন্তানদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত ইউনুস আলী ও মাহিন ইসলামকে গত ২০ মে উপজেলা ও পৌর যুব বিভাগের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে পাটগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আরও কয়েকজন স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলে।

তবে উপজেলা জামায়াতের নেতারা দাবি করেছেন, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। সংগঠনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ঘটনা জানার পর অভিযুক্তদের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা।

অব্যাহতি পাওয়া ইউনুস আলী দাবি করেছেন, যুবকেরা বৈধ কাগজপত্র নিয়েই রাশিয়ায় গেছেন। সেখানে গিয়ে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বিষয়টি সমাধানে এজেন্সি ও দুই দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া সব টাকা মাহিন ইসলামের কাছে দিয়েছেন এবং মাহিন সেই অর্থ এজেন্সিকে দিয়েছেন।

অন্যদিকে মাহিন ইসলাম অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না এবং পুরো বিষয়টি ইউনুস আলী পরিচালনা করেছেন।

পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হক জানিয়েছেন, ঘটনাটি সম্পর্কে তারা অবগত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা ও মানবপাচার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে যুবকদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে চাকরির প্রলোভনে প্রতারণার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি যাচাই ছাড়া বিদেশগামীদের কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি সরকারকে আরও কঠোর নজরদারি ও মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন