চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার জট কমানো, বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বড় উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ফ্রিজার, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল, যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্যসহ মোট ১০২ কনটেইনার পণ্য অনলাইন নিলামের মাধ্যমে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিচালিত এই নিলাম কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ক্রেতাদের অংশগ্রহণ আরও সহজ করা হবে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস ‘ই-অকশন-৬/২০২৬’ কর্মসূচির আওতায় মোট ৪৪টি পৃথক লটে ১০২ কনটেইনার পণ্য নিলামে তুলছে। দীর্ঘদিন ধরে অখালাস অবস্থায় থাকা এবং নিলামযোগ্য এসব পণ্য বিক্রির মাধ্যমে বন্দরের মূল্যবান জায়গা খালি করা হবে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা আরও বাড়বে এবং কনটেইনার জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ও রোধ করা সম্ভব হবে।
ই-নিলামে অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের শিল্প ও বাণিজ্যিক পণ্য রাখা হয়েছে। নিলামে ওঠা উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে—
- বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল
- শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ
- কাগজ ও কাগজজাত পণ্য
- ফেব্রিক্স ও বস্ত্রসামগ্রী
- গৃহস্থালি ব্যবহার্য পণ্য
- ফ্রিজার
- জেনারেটর
- ট্রান্সফরমার
- লাইম স্টোন
- কোয়ার্টজ পাউডার
এসব পণ্যের অনেকগুলো শিল্প, নির্মাণ, উৎপাদন ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনবিআর জানিয়েছে, আগ্রহী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো ঘরে বসেই বাংলাদেশ কাস্টমসের অফিসিয়াল ই-অকশন পোর্টালে নিবন্ধন করে নিলামে অংশ নিতে পারবেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দরপত্র জমা দেওয়ার সুবিধা থাকায় দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে।
নিবন্ধনের পর অংশগ্রহণকারীরা নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে অনলাইনে বিড বা দরপত্র দাখিল করতে পারবেন। ফলে প্রচলিত নিলাম ব্যবস্থার তুলনায় সময় ও খরচ উভয়ই কমবে।
নিলাম কার্যক্রমে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে। এতে মানবিক হস্তক্ষেপ কমবে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে।
ক্রেতাদের সুবিধার্থে পণ্য সরেজমিনে পরিদর্শনের সুযোগও রাখা হয়েছে। ফলে আগ্রহী দরদাতারা নিলামে অংশ নেওয়ার আগে পণ্যের অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নিতে পারবেন। এরপর অনলাইনে দরপত্র জমা দিয়ে নিলামে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
যদিও দরপত্র অনলাইনে জমা দেওয়া যাবে, তবে নিলামের নিয়ম অনুযায়ী জামানতের পে-অর্ডার এবং প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কাগজপত্র নির্ধারিত দরপত্র বাক্সে সরাসরি জমা দিতে হবে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে দরপত্র গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পণ্য খালাস করতে হবে বিদ্যমান ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪’-এর প্রযোজ্য শর্তাবলি অনুসরণ করে।
অর্থাৎ নিলামে পণ্য ক্রয় করলেই তাৎক্ষণিকভাবে পণ্য গ্রহণ করা যাবে না; বরং নির্ধারিত আইন, বিধি এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই পণ্য খালাস করতে হবে।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ‘ই-অকশন-৬/২০২৬’-এর দরপত্র বাক্স আগামী ১৮ জুন সকাল ১১টায় উন্মুক্ত করা হবে। ওই সময় জমা পড়া সব দরপত্র মূল্যায়ন করে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
নিলাম সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য, নিবন্ধন পদ্ধতি, অংশগ্রহণের শর্ত এবং পণ্যের তালিকা জানতে আগ্রহীদের কাস্টমসের অফিসিয়াল ই-অকশন পোর্টাল পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা অখালাসকৃত পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনে সময় কম লাগবে।
সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবে ই-নিলাম ব্যবস্থার বিস্তার কাস্টমস কার্যক্রমকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং অংশগ্রহণমূলক করে তুলবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

