বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব এবং টিকা সংকটের আশঙ্কা নিয়ে আগেই সরকারকে একাধিকবার সতর্ক করেছিল UNICEF। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে অন্তত পাঁচটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে সম্ভাব্য টিকা সংকটের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থাটি। শুধু চিঠিই নয়, সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রায় ১০টি বৈঠকেও একই বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীতে ইউনিসেফ বাংলাদেশের কার্যালয়ে আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব এবং চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলা কার্যক্রম’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি Rana Flowers।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে টিকা সরবরাহে ঘাটতির বিষয়টি অনেক আগেই চিহ্নিত করেছিল ইউনিসেফ। বিশেষ করে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
ইউনিসেফের তথ্যমতে, গত বছরের আগস্ট থেকে নভেম্বর সময়কালে বাংলাদেশে মাত্র ১ কোটি ৭৮ লাখ ডোজ হামের টিকা পৌঁছায়। অথচ দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭ কোটি ডোজ। প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ অনেক কম হওয়ায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে বিঘ্নিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে এমন দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে শিশুদের বড় একটি অংশ টিকার বাইরে থেকে যায়। এর ফলে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, এই সংকটের পেছনে অর্থের ঘাটতি বা তহবিলের অভাব দায়ী ছিল না। মূল সমস্যা ছিল টিকা সংগ্রহ ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা। সময়মতো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ায় দেশে পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা দেশের টিকাদান ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো টিকা না পেলে শিশুদের মধ্যে দ্রুত এই রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসকদের মতে, হাম শুধু জ্বর বা ত্বকে ফুসকুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নিউমোনিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের জটিলতাসহ নানা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শিশু মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক টিকা সংকট সেই অর্জনকে হুমকির মুখে ফেলেছিল বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্টরা।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নতির দিকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংবাদ সম্মেলনে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ইতোমধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশু হামের টিকা পেয়েছে এবং বর্তমানে হাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার ফলে সংক্রমণ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে টিকা সংকট এড়াতে স্বাস্থ্যখাতে পরিকল্পিত ও দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি। বিশেষ করে টিকা আমদানি, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি এবং কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

