কাঁচা চামড়ার বাজারে আবারও সংকটের আশঙ্কা, ঈদ সামনে রেখে দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা

Share

বাংলাদেশের চামড়া শিল্প একসময় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রফতানি খাত হিসেবে পরিচিত ছিল। তৈরি পোশাক শিল্পের পর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় উৎস হিসেবে এই খাতকে ঘিরে সরকারের ছিল বড় পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা। কিন্তু গত এক দশকে ধারাবাহিক সংকট, রফতানি কমে যাওয়া, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা এবং ব্যাংকঋণের খেলাপির চাপ মিলিয়ে চামড়া শিল্প এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আবারও নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া এবার কি ন্যায্যমূল্য পাবে, নাকি আগের বছরের মতো কম দামে বিক্রি হবে কিংবা সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাবে—এমন প্রশ্ন এখন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঘুরপাক খাচ্ছে।

চামড়া শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের দিন এবং পরবর্তী কয়েকদিন চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু এই সময়ে ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন হয় বড় অঙ্কের কার্যকর মূলধন, যা সাধারণত ব্যাংকঋণের মাধ্যমে আসে। এবার সেই ঋণপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ছিল ৬৪৪ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে বিতরণ হয়েছিল প্রায় ১২৫ কোটি টাকা।

এদিকে চলতি বছরে দেশে এক কোটির বেশি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ২৯৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাস্তবে এর অর্ধেকও হয়তো বাজারে পৌঁছাবে না।

ব্যাংকারদের মতে, চামড়া খাতের অধিকাংশ ব্যবসায়ী আগের ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করতে পারেননি। ফলে তাদের বড় অংশ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন ঋণ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের তথ্য বলছে, চামড়া খাতে তাদের মোট ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৭৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৫৩ কোটি টাকাই খেলাপি। বাকি ঋণের একটি অংশ পুনঃতফসিল করা হলেও অধিকাংশ গ্রাহক নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এ কারণেই চলতি বছর নতুন করে চামড়া খাতে ঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ।

অন্যদিকে অগ্রণী ব্যাংক চলতি বছর ৯১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও কর্মকর্তারা নিশ্চিত নন, শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে কি না।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, চামড়া খাতের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ঋণ বিতরণে ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।

ট্যানারি মালিকরা অভিযোগ করছেন, কাগজে-কলমে বড় অঙ্কের ঋণ বরাদ্দ দেখানো হলেও সেই অর্থ বাস্তবে ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছায় না।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, সরকার লবণ বিতরণসহ নানা উদ্যোগ নিলেও প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ না পেলে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে বড় সংকট তৈরি হবে।

সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, এবার প্রায় এক কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকিং সহায়তা না থাকায় ব্যবসায়ীরা নিজেদের সীমিত মূলধন দিয়েই বাজার চালানোর চেষ্টা করছেন।

চামড়া শিল্পের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। ২০১৩ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই নানা জটিলতা সামনে আসে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০১৯ সালের কোরবানির ঈদে।

সে সময় সরকার নির্ধারিত দাম ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গরুর চামড়া মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। কোথাও কোথাও চামড়া বিক্রি না হওয়ায় মাটিতে পুঁতে ফেলা কিংবা ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এই ঘটনার পর থেকেই মৌসুমি ব্যবসায়ী ও স্থানীয় আড়তদারদের বড় অংশ চামড়ার ব্যবসা থেকে সরে যেতে শুরু করেন। ফলে দেশের চামড়া সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন তৈরি হয়।

দেশীয় সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না দেশের ট্যানারিগুলো। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ বা এলডব্লিউজি সনদ অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ।

এর প্রভাব পড়েছে রফতানিতে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে চামড়া সংগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে দেশের চামড়ার বড় অংশ রফতানি হচ্ছে মূলত চীনে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ২৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের চামড়া রফতানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ কোটি ৮২ লাখ ডলারে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রফতানি হয়েছে মাত্র ১০ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের চামড়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে চামড়া খাতে মোট ব্যাংকঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা।

আসন্ন কোরবানির ঈদে চামড়ার বাজারে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সরকার এবার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। এছাড়া খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

চামড়া সংরক্ষণের জন্য দেশের মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোতে বিনামূল্যে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগভিত্তিক মনিটরিং টিম গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সরকার লবণ ছাড়া চামড়া পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচার ঠেকাতে বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, চামড়া খাতে ঋণপ্রবাহ সচল রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে খেলাপি গ্রাহকদের নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। কারণ তারা স্থানীয়ভাবে নগদ টাকায় চামড়া সংগ্রহ করেন এবং পরে ট্যানারি বা আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন।

কিন্তু ট্যানারিগুলো যদি পর্যাপ্ত অর্থ না পায়, তাহলে বাজারে চাহিদা কমে যাবে। তখন গ্রামের সংগ্রহকারীরা বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করবেন অথবা সংরক্ষণ করতে না পেরে ফেলে দেবেন।

এবার অতিরিক্ত গরম, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থাও বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো লবণ ব্যবহার না করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে দেশের চামড়া শিল্প আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা উদ্যোগ নিলেও মূল সংকট এখনও অর্থায়ন ঘিরেই রয়ে গেছে।

যদি পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা না যায় এবং মাঠপর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর না হয়, তাহলে এবারও কোটি কোটি টাকার কাঁচা চামড়া ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সেই সঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, আড়তদার এবং ট্যানারি মালিকরা।

চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন কার্যকর অর্থায়ন, স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা, আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের উদ্যোগ। তা না হলে একসময় দেশের সম্ভাবনাময় এই রফতানি খাত আরও গভীর সংকটে পড়ে যেতে পারে।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন