মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফোনালাপ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এই সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত ১ জুন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন আলাপ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই আলোচনায় ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অকৃতজ্ঞতার অভিযোগও তোলেন বলে জানা যায়।
পরবর্তীতে ৩ জুন সম্প্রচারিত জনপ্রিয় ‘পড ফোর্স ওয়ান’ পডকাস্টে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে আলোচনার সময় তিনি নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, এটি ব্যক্তিগত রাগ বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। বরং লেবাননে চলমান সংঘাত অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থান তাকে হতাশ করেছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখনও ইতিবাচক রয়েছে এবং অতীতে তাদের মধ্যে সফলভাবে কাজ করার বহু অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার মতে, মতবিরোধ থাকলেও দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি অটুট রয়েছে।
বর্তমান উত্তেজনার অন্যতম কারণ লেবাননের পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ অনুসন্ধান করছে, সেখানে ইসরায়েল লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখা। কিন্তু ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ সেই প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।
এদিকে তেহরানও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো অর্থবহ আলোচনায় বসবে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছিল, তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘটনাকে বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখতে চান না। সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ঘনিষ্ঠ মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিনের মিত্র এবং উভয় দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রয়েছে। কোনো কোনো বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও তা সাধারণত দ্রুত সমাধান হয়ে যায়। নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন, বর্তমান পরিস্থিতিও শেষ পর্যন্ত সমঝোতার মাধ্যমে নিরসন হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিষয়টি শুধু বৈদেশিক নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণের একটি অংশ ইসরায়েল সম্পর্কিত নীতির বিষয়ে আগের তুলনায় ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজা ও লেবানন ইস্যুতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণে মার্কিন ভোটারদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন একদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।
এছাড়া প্রশাসনের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকও ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আরও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োজন।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কিছুটা রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখা ট্রাম্পের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক হতে পারে। বিশেষ করে যদি তিনি ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা উত্তেজনা হ্রাসের উদ্যোগকে সফল করতে চান, তাহলে ইসরায়েলের সব পদক্ষেপের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দেওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতায় ট্রাম্প একদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টাও করছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মতবিরোধ নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতে বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা এবং জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ও বিভিন্ন কৌশলগত ও নীতিগত প্রশ্নে মতানৈক্য দেখা গেছে।
বিশেষ করে ইরান, ফিলিস্তিন এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে একাধিকবার ভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়েছে। তবে এসব মতবিরোধ সত্ত্বেও দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সাধারণত শক্তিশালী অবস্থানে থেকেছে।
তবে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। সেই কারণে সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ইরান, লেবানন, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র সব পক্ষের অবস্থান আগামী কয়েক মাসে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় দুর্বল হয়, তাহলে ইরানকে ঘিরে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে দুই দেশ যদি দ্রুত মতপার্থক্য দূর করতে সক্ষম হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সাম্প্রতিক ফোনালাপের পর আন্তর্জাতিক মহল এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কের এই সাময়িক অস্বস্তি শেষ পর্যন্ত কতটা গভীর প্রভাব ফেলে এবং তা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কোন দিকে নিয়ে যায়।

