ভারতে ঈদের নামাজ ঘিরে বাড়ছে বিধিনিষেধ, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় মুসলিম সম্প্রদায়

Share

ভারতে ঈদুল আজহার প্রস্তুতি চললেও অনেক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় উৎসবের আনন্দের বদলে বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে ঈদের জামাত কোথায় এবং কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, পুলিশি নজরদারি এবং খোলা জায়গায় নামাজ আদায় নিয়ে কড়াকড়ির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি ছোট মসজিদে সম্প্রতি ঈদুল আজহার নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেখানে উৎসবের আমেজ খুব একটা চোখে পড়েনি। বরং মুসল্লিদের আলোচনায় উঠে এসেছে নিরাপত্তা, পুলিশি অনুমতি, রাস্তার ব্যবহার এবং ব্যারিকেডের মতো বিষয়।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা মুসল্লিদের বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, মসজিদের বাইরে ভিড় না করতে, গেটের সামনে জমায়েত এড়িয়ে চলতে এবং কোনো ধরনের উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া না জানাতে। মুসল্লিদের আরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, জায়গা সংকট হলে পরবর্তী জামাতের জন্য অপেক্ষা করতে।

স্থানীয় মুসল্লিদের অনেকেই মোবাইলে পুলিশের পাঠানো নির্দেশনা দেখছিলেন। সেই বার্তায় প্রকাশ্যে বা রাস্তার ওপর নামাজ আদায় না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।

মালিয়ানা গ্রাম মুসলিমদের জন্য দীর্ঘদিনের এক বেদনাদায়ক স্মৃতির নাম। ১৯৮৭ সালের মে মাসে সেখানে ভয়াবহ সহিংসতায় ৭২ জন মুসলিম নিহত হন। অভিযোগ ছিল, হিন্দু জনতা ও প্রাদেশিক আর্মড কনস্ট্যাবুলারির সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

দীর্ঘ ৩৬ বছরের বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালে আদালত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের খালাস দেন। সেই ঘটনার স্মৃতি এখনো এলাকার মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তবে এবারকার উদ্বেগ মূলত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং সামাজিক উত্তেজনার কারণে তৈরি হয়েছে।

২০১৪ সালে Narendra Modi নেতৃত্বাধীন Bharatiya Janata Party ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাব বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন ডানপন্থী হিন্দু সংগঠন খোলা জায়গায় মুসলিমদের নামাজ আদায়ের বিরোধিতা করে আসছে।

তাদের দাবি, রাস্তা বা পার্কে নামাজ আদায় করলে যানজট সৃষ্টি হয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়। এর জেরে বহু এলাকায় মুসলিমদের রাস্তা, পার্ক কিংবা খালি জায়গায় নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোলা জায়গায় নামাজের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন পূর্বের অনুমতিও বাতিল করেছে।

সম্প্রতি Vishva Hindu Parishad সারা দেশে রাস্তার ওপর নামাজ নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। সংগঠনটির অভিযোগ, খোলা জায়গায় নামাজ আদায় মুসলিমদের ‘শক্তি প্রদর্শনের’ অংশ।

তবে মুসলিমদের বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন। তাদের দাবি, ভারতের জনবহুল এলাকাগুলোর অধিকাংশ মসজিদ ও ঈদগাহে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মুসল্লির জায়গা হয় না। ফলে ঈদ বা জুমার নামাজের সময় সাময়িকভাবে রাস্তার কিছু অংশ ব্যবহার করা ছাড়া অনেক সময় আর কোনো বিকল্প থাকে না।

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মুসলিম বাস করেন। ২০১৭ সাল থেকে সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন Yogi Adityanath। তিনি অতীতে মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য বহুবার আলোচনায় এসেছেন।

তাঁর সরকারের আমলে রাস্তা ও খোলা স্থানে মুসলিমদের নামাজ আদায়ের ওপর কড়াকড়ি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ১৮ মে যোগী আদিত্যনাথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, মুসলিমদের ‘শিফটে’ ঈদের নামাজ আদায় করা উচিত। তিনি আরও বলেন, “শান্তিপূর্ণভাবে মেনে নিলে ভালো, না মানলে অন্য পদ্ধতি নেওয়া হবে।”

এই বক্তব্যের পর মুসলিমদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বুঝতে পারছেন না, ‘অন্য পদ্ধতি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে।

মিরাটের এক মুসলিম বাসিন্দা জানিয়েছেন, গত বছর খোলা জায়গায় নামাজ আদায়ের অভিযোগে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। কোথাও কোথাও বাড়িঘর ভাঙার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্ট যাচাই আটকে দেওয়ার মতো হয়রানির ঘটনাও সামনে আসে। এসব কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে এবং অনেকে প্রকাশ্যে নামাজ আদায় নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন।

আলিগড় জেলার দোকানদার আরিফ মালিক বলেন, গত ঈদে কয়েক মিনিটের জন্য খোলা মাঠে নামাজ পড়ার পর পুলিশ মুসল্লিদের ধাওয়া করে। এরপর থেকেই পরিবারগুলো মানুষকে সতর্ক থাকতে বলছে এবং ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ কমিটিগুলো ঈদের আয়োজন নতুনভাবে পরিকল্পনা করছে। কোথাও ছোট ছোট জামাতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, আবার কোথাও মুসল্লিদের ভাগ করে নির্দিষ্ট সময়ে আসতে বলা হচ্ছে।

নামাজ শেষে দ্রুত স্থান ত্যাগ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেন কোনো মুসল্লি সাময়িকভাবেও রাস্তার ওপর অবস্থান না করেন।

অনেক এলাকায় মসজিদ কর্তৃপক্ষ মুসল্লিদের শান্ত থাকার এবং কোনো উসকানিতে প্রতিক্রিয়া না দেখানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। কারণ সামান্য উত্তেজনাও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

ভারতে মুসলিমদের ঈদের নামাজ ঘিরে চলমান এই পরিস্থিতি দেশটির ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই মনে করছেন, ধীরে ধীরে তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসছে।

অন্যদিকে প্রশাসন ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো দাবি করছে, তারা কেবল আইনশৃঙ্খলা ও জনস্বার্থ রক্ষার জন্যই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তবে বাস্তবে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে যে ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসবের আনন্দকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।

সুত্র:ইত্তেফাক

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন