দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২৮৭ জনের শরীরে হাম অথবা এর উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। ফলে রোগটির বিস্তার ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রোববার (৭ জুন) স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গত একদিনে হামের উপসর্গে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এখানে চারজন রোগী প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ এবং খুলনা বিভাগে একজন করে মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২০ জনে। ক্রমবর্ধমান এই মৃত্যুহার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৬ জনের শরীরে হাম রোগ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে আরও ১ হাজার ২২১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। সব মিলিয়ে একদিনে আক্রান্ত ও উপসর্গ শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৭ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৭৯ হাজার ১২ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ৯ হাজার ৬৮৬ জনের শরীরে হাম রোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
হামের সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৬৪ হাজার ২৬৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এত বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায় চিকিৎসকদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদনে ইতিবাচক তথ্যও রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৬০ হাজার ৮৪ জন ইতোমধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। চিকিৎসা ও সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ফলে অনেক রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সংক্রমণের হার এখনও উচ্চ পর্যায়ে থাকায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো টিকা গ্রহণ করলে এই রোগ থেকে কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং টিকাদান কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে রোগটির বিস্তার কমানো সম্ভব।
হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শিশুদের টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এই সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

