বিশ্ব ক্রিকেটে ফের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসি। আগামী ৩০ মে অহমদাবাদে অনুষ্ঠিত হতে চলা আইসিসি বোর্ড বৈঠকে ক্রিকেটের একাধিক নতুন নিয়ম নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ইতিমধ্যেই ক্রিকেট মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে একই ম্যাচে লাল ও গোলাপি বল ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং এক দিনের ক্রিকেটে কোচদের মাঠে প্রবেশের পরিকল্পনা ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ।
ক্রিকেটকে আরও আধুনিক, দর্শকবান্ধব এবং বাস্তবসম্মত করে তুলতেই এই নতুন নিয়মগুলি নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে আইসিসি। যদি সবুজ সংকেত মেলে, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
টেস্ট ক্রিকেটে একসঙ্গে লাল ও গোলাপি বল ব্যবহারের পরিকল্পনা
বর্তমানে টেস্ট ক্রিকেটে সাধারণত দুই ধরনের বল ব্যবহার করা হয়। দিনের টেস্টে ব্যবহৃত হয় লাল বল এবং দিন-রাতের টেস্টে ব্যবহৃত হয় গোলাপি বল। কিন্তু আবহাওয়া বা আলোর সমস্যার কারণে দিনের টেস্টে বহু সময় খেলা বন্ধ রাখতে হয়। বিশেষ করে মেঘলা পরিবেশ বা কম আলোয় লাল বল স্পষ্ট দেখা না গেলে খেলা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই নতুন প্রস্তাব সামনে এসেছে। আইসিসি ভাবছে, দিনের বেলার টেস্টে যদি আলোর সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে ম্যাচের মাঝপথে গোলাপি বলে খেলা চালানো যেতে পারে। অর্থাৎ একই টেস্ট ম্যাচে দুই ধরনের বল ব্যবহার হতে পারে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিয়ম চালু হলে খেলা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমবে। দর্শকেরাও টানা খেলা উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলিও লাভবান হবে, কারণ খেলা বন্ধ থাকলে সম্প্রচারে প্রভাব পড়ে।
দুই দলের সম্মতিতেই বদলাবে বলের রং
সূত্রের খবর, ম্যাচ চলাকালীন লাল বল থেকে গোলাপি বলে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দুই দলের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। আপাতত মৌখিক সম্মতির ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথা ভাবা হচ্ছে।
তবে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। যেমন— কোন ওভারে বল বদলানো হবে, নতুন বলের অবস্থা কেমন হবে বা দুই বলের সুইং ও বাউন্সের পার্থক্য কীভাবে সামলানো হবে— এসব বিষয় নিয়ে এখনও বিস্তারিত নির্দেশিকা তৈরি হয়নি।
তবুও ক্রিকেট প্রশাসকদের ধারণা, আধুনিক ক্রিকেটে এই পরিবর্তন সময়ের দাবি। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে আইসিসি নতুন নতুন উপায় খুঁজছে।
অক্টোবর থেকেই কার্যকর হতে পারে নতুন নিয়ম
সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ১ অক্টোবর থেকেই এই নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ চলতি বছরের শেষ দিকেই আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে দেখা যেতে পারে লাল ও গোলাপি বলের যুগল ব্যবহার।
ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বিষয়টি নিঃসন্দেহে নতুন অভিজ্ঞতা হবে। কারণ এতদিন পর্যন্ত একটি টেস্ট ম্যাচে এক ধরনের বলই ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এই পরিবর্তন ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন অধ্যায় খুলতে পারে।
ওয়ানডে ক্রিকেটে মাঠে ঢুকতে পারেন কোচ
শুধু টেস্ট ক্রিকেট নয়, এক দিনের ক্রিকেটেও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ওয়ানডে ম্যাচে জলপানের বিরতির সময় শুধুমাত্র পরিবর্ত ক্রিকেটার মাঠে প্রবেশ করতে পারেন। তাঁরাই কোচের বার্তা পৌঁছে দেন ব্যাটার বা বোলারদের কাছে।
কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ভবিষ্যতে কোচ নিজেই মাঠে ঢুকে ক্রিকেটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারবেন। এতে ম্যাচের কৌশল আরও দ্রুত বোঝানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ইতিমধ্যেই এই নিয়ম চালু রয়েছে। ফলে ওয়ানডেতেও সেই একই নিয়ম কার্যকর করা খুব একটা কঠিন হবে না।
কোচদের পোশাক নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা
যদিও কোচ মাঠে ঢুকলে তাঁকে ক্রিকেটীয় পোশাক পরতেই হবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। বর্তমানে পরিবর্ত ক্রিকেটারদের নির্দিষ্ট পোশাক মেনে মাঠে নামতে হয়। কোচদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
ক্রিকেট বোর্ডগুলির একাংশ মনে করছে, কোচদের জন্য আলাদা ড্রেস কোড থাকা উচিত। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, শুধুমাত্র পরিচয়পত্র থাকলেই মাঠে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
টি-টোয়েন্টিতে কমতে পারে ইনিংস বিরতির সময়
আইসিসি বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উঠেছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দুই ইনিংসের মাঝে বর্তমানে ২০ মিনিট বিরতি থাকে। সেটি কমিয়ে ১৫ মিনিট করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এর ফলে ম্যাচ আরও দ্রুত শেষ হবে এবং সম্প্রচারের সময়ও কম লাগবে। ব্যস্ত সময়সূচির ক্রিকেটে এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা।
বিশেষ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের যুগে সময় বাঁচানো এখন অন্যতম বড় লক্ষ্য। তাই টি-টোয়েন্টিকে আরও গতিময় করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বোলিং অ্যাকশন যাচাইয়ে ব্যবহার হতে পারে হকআই প্রযুক্তি
নতুন নিয়মের তালিকায় রয়েছে বোলিং অ্যাকশন নিয়েও বড় ভাবনা। কোনও বোলারের অ্যাকশন বৈধ কি না, তা যাচাই করতে মাঠের আম্পায়াররা ভবিষ্যতে হকআই প্রযুক্তির সাহায্য নিতে পারেন।
এতে সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ শুধুমাত্র চোখের আন্দাজে অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
হকআই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বল ছাড়ার সময় হাতের কোণ ও নড়াচড়া আরও স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। ফলে বিতর্কও কমবে।
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
এই সমস্ত বিষয় নিয়েই বৃহস্পতিবার আইসিসি ক্রিকেট কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকের নেতৃত্ব দেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক Sourav Ganguly।
ক্রিকেটকে আরও আধুনিক এবং প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতেই এই পরিবর্তনগুলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এখন ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর আগামী ৩০ মে-র বোর্ড বৈঠকের দিকে। কারণ সেখানেই ঠিক হবে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।

