বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় ধস, মুদ্রাস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ

Share

বিশ্ববাজারে আবারও বড় ধাক্কা খেল স্বর্ণ ও রুপার বাজার। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মুদ্রানীতির আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে মূল্যবান এই দুই ধাতুর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা থাকলেও উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এখন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। ফলে স্বর্ণের বাজারে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের দরপতন।

আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম বুধবার প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪৪৪ দশমিক ৬৪ ডলারে নেমে আসে। দিনের শুরুতে স্বর্ণের দর আরও নিচে নেমে গিয়ে গত ২৭ মার্চের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছায়।

অন্যদিকে, জুন মাসের ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচারও কমেছে প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। এতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৪৫ দশমিক ২০ ডলার।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদে ঝুঁকলেও এখন উচ্চ সুদের আশঙ্কা স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি করছে।

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলকে ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

জেনার মেটালসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র মেটালস স্ট্র্যাটেজিস্ট পিটার গ্রান্ট জানিয়েছেন, শুরুতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আশাবাদ থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই ইতিবাচক মনোভাব দ্রুত কমে যাচ্ছে।

তার মতে, এই সংঘাত শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতাই বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিও তীব্র করছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়।

তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিতে। কারণ জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে প্রায় সব খাতেই খরচ বেড়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে। আর সুদের হার বাড়লে সাধারণত স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের চাহিদা কমে যায়।

এর মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে। দেশটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি কাঠামোগত সমঝোতার অংশ হিসেবে আগামী এক মাসের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে।

এছাড়া ইরানের আশপাশের অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনীও ধীরে ধীরে সরিয়ে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

এই খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে সাময়িকভাবে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমে আসে। কারণ বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি হয়তো ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনো পুরো সংকটের সমাধান হয়নি। ফলে বাজারে অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি।

বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় নজর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের দিকে। বাজারে জোরালো আলোচনা চলছে যে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ফেড আবারও ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার বাড়াতে পারে।

মিনিয়াপোলিস ফেডের প্রেসিডেন্ট নীল কাশকারি বলেছেন, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। তাই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে।

তবে তিনি এটাও জানিয়েছেন, ঠিক কবে সুদের হার পরিবর্তন করা হবে সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই তথ্য প্রকাশের পর ফেডের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বাজারে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

স্বর্ণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দামেও বড় পতন দেখা গেছে। স্পট সিলভারের দাম প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭৪ দশমিক ৮২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প খাতে রুপার চাহিদা কিছুটা কমে যাওয়ায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে ধীরগতির কারণে রুপার ব্যবহার কমছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে রুপার বাজার নিয়ে এখনো আশাবাদী অনেক বিনিয়োগকারী।

ব্যাংক অব আমেরিকা এক বিশ্লেষণধর্মী নোটে জানিয়েছে, আগামী মাসগুলোতে যদি স্বর্ণের দাম পুনরায় বাড়তে শুরু করে, তাহলে রুপার দামও প্রতি আউন্স ১০০ ডলারের ওপরে যেতে পারে।

তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, মৌলিক চাহিদা কম থাকায় দীর্ঘ সময় সেই উচ্চমূল্য ধরে রাখা কঠিন হবে।

অর্থাৎ বাজারে সাময়িক উল্লম্ফন দেখা দিলেও স্থায়ীভাবে উচ্চমূল্য ধরে রাখতে হলে শিল্প খাতে চাহিদা বাড়তে হবে।

মূল্যবান ধাতুর অন্যান্য বাজারেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাটিনামের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৯১৯ দশমিক ৩০ ডলারে নেমেছে।

অন্যদিকে প্যালাডিয়ামের দাম সামান্য বেড়ে ১ হাজার ৩৮৪ দশমিক ৮৬ ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গাড়ি শিল্পে প্যালাডিয়ামের ব্যবহার বাড়ায় এই ধাতুর বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি এক ধরনের অস্থির সময় পার করছে। একদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

স্বর্ণ ও রুপার বাজারে সাম্প্রতিক দরপতন সেই অনিশ্চয়তারই প্রতিফলন। আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি মূল্যবান ধাতুর বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সূত্র: রয়টারস

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন