রাজধানীর মিরপুরের কালশী এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যায় কালশীর একটি বস্তিতে আগুন লাগার পর মুহূর্তেই তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময়ের চেষ্টায় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের লেলিহান শিখা দূর থেকে দেখা যায় এবং বস্তিবাসীরা নিজেদের মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করারও সুযোগ পাননি।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটে কালশীর বস্তিতে আগুন লাগার খবর আসে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ঘটনাস্থলে রওনা দেয় দমকল বাহিনীর সদস্যরা। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে, সন্ধ্যা ৭টা ৩২ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে।
পরবর্তীতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় আরও ইউনিট যোগ করা হয়। একপর্যায়ে মোট ১৫টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয়। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, আশপাশের এলাকাতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে নিরলসভাবে কাজ করেন। সরু রাস্তা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয় তাদের। তবুও দ্রুত সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে আগুন আশপাশের ভবন ও অন্যান্য স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও আগুন নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করেন। অনেকে পানি সরবরাহ এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। তারা এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখেন।
এছাড়া উদ্ধার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আগুনের ঘটনায় যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। পাশাপাশি কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটিও এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর তদন্ত শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট কিংবা গ্যাসের কোনো ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
বস্তিবাসীর মাঝে আতঙ্ক ও দুর্ভোগ
এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বস্তির নিম্নআয়ের মানুষজন। আগুনে অনেক পরিবারের বসতঘর পুড়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারগুলোর। অনেকেই চোখের সামনে নিজেদের ঘরবাড়ি পুড়ে যেতে দেখেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, সংকীর্ণ রাস্তা এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাব বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশেষ করে বস্তি এলাকাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
কালশীর এই অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা দ্রুত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বস্তি এলাকাগুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধি ও জরুরি নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত তদারকি, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা থাকলে এমন দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
রাজধানীর কালশীর বস্তিতে ভয়াবহ এই আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। আগুনের কারণ ও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানতে তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে সবাই।

