ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বহুল আলোচিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে চলতি বছরের শেষ দিনে। এমন বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় শুরু হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) ৯০তম বৈঠক। বৃহস্পতিবার (২১ মে) শুরু হওয়া এই তিন দিনব্যাপী বৈঠক আগামী শনিবার পর্যন্ত চলবে। দুই দেশের কূটনৈতিক ও পানি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা এতে অংশ নিচ্ছেন।
বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির পুনর্নবীকরণকে কেন্দ্র করে এবারের বৈঠক ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি গুরুত্ব। কারণ, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এটিই দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের শেষ আনুষ্ঠানিক বৈঠক। ফলে ভবিষ্যৎ পানি বণ্টন নীতিমালা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে এই আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (২০ মে) বৈঠকে অংশ নিতে কলকাতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশের ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জয়েন্ট রিভার কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ আনোয়ার কবির।
এছাড়াও প্রতিনিধি দলে রয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাউথ এশিয়া উইংয়ের পরিচালক মোহাম্মদ বাকি বিল্লাহ। কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর (পলিটিক্যাল) মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন এবং কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল) মোহাম্মদ ওমর ফারুক আকন্দ।
অন্যদিকে ভারতের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির কেন্দ্রীয় জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ দপ্তরের একজন প্রধান প্রকৌশলীও আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
এবারের বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির পুনর্নবীকরণ। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ৩০ বছর মেয়াদি ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
দীর্ঘদিন ধরে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলে আসছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, পরিবেশ এবং নৌপথে এর প্রভাব পড়ে। ফলে নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে এবার আলোচনায় জোর দিচ্ছে ঢাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া এবং উজানে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বর্তমান পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। তাই নতুন চুক্তিতে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
বৈঠকের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল মুর্শিদাবাদ সফর করবে। সেখানে তারা ফারাক্কা ব্যারাজ এলাকায় গিয়ে গঙ্গা নদীর পানির প্রবাহ সরেজমিনে পরিমাপ করবেন।
দুই দেশের পানি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে এই পরিমাপ কার্যক্রম পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে। পরে শুক্রবার তারা কলকাতায় ফিরে আসবেন। এরপর কলকাতার একটি অভিজাত হোটেলে শুক্র ও শনিবার মূল বৈঠকের কার্যক্রম চলবে।
ফারাক্কা ব্যারাজ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ভারত পানি কূটনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার কারণে পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায়, যার ফলে কৃষি, মৎস্য এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট নিয়মে বণ্টন করা হয়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, গঙ্গায় পানির প্রবাহ যদি ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি থাকে, তাহলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক পানি এবং অবশিষ্ট অংশ পাবে বাংলাদেশ।
আবার পানির প্রবাহ যদি ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং বাকি পানি পাবে ভারত।
অন্যদিকে, প্রবাহ যদি ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হয়, তাহলে দুই দেশ সমানভাবে পানি ভাগ করে নেবে।
এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে গত তিন দশকে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকবার আলোচনা ও মতবিনিময় হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর প্রবাহ ও পরিবেশগত পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ায় নতুন বাস্তবতায় চুক্তি হালনাগাদের দাবি উঠেছে।
যদিও এবারের বৈঠকের মূল ফোকাস গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, তবুও তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ইস্যুও আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যৌথ নদী কমিশনের এই বৈঠককে দুই দেশের ভবিষ্যৎ পানি কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভিত্তিক সহযোগিতা বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে। যৌথ নদীগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা শুধু কৃষি বা পরিবেশ নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নৌ যোগাযোগ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তাই কলকাতার এই বৈঠক শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আয়োজন নয়, বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পানি কৌশল নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

