ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ অ্যালবাম: প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ফারাক

Share

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, এটি বিশ্বের কোটি মানুষের আবেগের নাম। প্রতি আসরেই বিশ্বকাপকে ঘিরে তৈরি হয় অসংখ্য স্মরণীয় গান, যা দর্শকদের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেয়। অতীতে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল সংগীত যেমন মানুষের হৃদয় জয় করেছে, তেমনি নতুন আসরকে ঘিরেও ভক্তদের প্রত্যাশা থাকে আকাশছোঁয়া।

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘অফিশিয়াল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ অ্যালবাম’। ১৮টি গানের এই সংকলনকে ঘিরে শুরু থেকেই ছিল ব্যাপক আগ্রহ। কারণ এতে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের জনপ্রিয় শিল্পীরা। তালিকায় রয়েছেন শাকিরা, স্টর্মজি, লিসা, বার্না বয়, জেলি রোল, কারিন লিওন এবং আরও অনেক পরিচিত নাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত তারকার উপস্থিতি কি একটি সফল অ্যালবাম নিশ্চিত করতে পেরেছে?

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক গানই সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। এসব গান শুধু টুর্নামেন্টের প্রচারণার জন্য নয়, বরং ফুটবলের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও বিশ্বব্যাপী সংযোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সেই কারণেই নতুন অ্যালবাম প্রকাশের পর শ্রোতারা আশা করেছিলেন এমন কিছু গান শুনতে পাবেন, যা মাঠের উত্তেজনাকে সঙ্গীতের মাধ্যমে তুলে ধরবে। কিন্তু বাস্তবে অ্যালবামটি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে হয়।

অ্যালবামের শুরুটা অবশ্য আশাব্যঞ্জক। জনপ্রিয় কে-পপ গ্রুপ ব্ল্যাকপিঙ্কের সদস্য লিসার গাওয়া ‘গোলস’ গানটি শুরু থেকেই প্রাণবন্ত একটি আবহ তৈরি করে।

ট্র্যাপ-অনুপ্রাণিত ইলেকট্রো বিট, শক্তিশালী রিদম এবং আধুনিক প্রযোজনা গানটিকে শ্রোতাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে। গানটি শোনার সময় অন্তত কিছুটা উত্তেজনা অনুভূত হয়, যা একটি বিশ্বকাপ অ্যালবামের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘গোলস’ শুনে মনে হতে পারে, পুরো অ্যালবামটি হয়তো একই মান ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই আশাবাদ খুব দ্রুতই ভেঙে যায়।

অ্যালবামের অধিকাংশ গান শুনলে মনে হয়, এগুলো কোনো শিল্পীর হৃদয়ের গভীরতা থেকে আসেনি। বরং এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, কিন্তু কাউকে বিশেষভাবে স্পর্শ না করে।

ফলে গানগুলোতে আবেগের গভীরতা কিংবা সৃজনশীলতার স্বতন্ত্রতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ইলেকট্রো-পপ, হিপ-হপ এবং বাণিজ্যিক পপের নানা উপাদান একসঙ্গে মেশানো হলেও সেগুলো একে অপরকে সমৃদ্ধ করার বদলে অনেক সময় বিশৃঙ্খল মনে হয়েছে। প্রতিটি গান যেন একই ধরনের প্রডাকশন টেমপ্লেট অনুসরণ করেছে।

ফলাফল হিসেবে শ্রোতারা পেয়েছেন এমন এক সংকলন, যা প্রযুক্তিগতভাবে নিখুঁত হলেও আবেগগতভাবে প্রায় শূন্য।

বিশ্বকাপ অ্যালবামের অন্যতম আকর্ষণ হওয়ার কথা ছিল শাকিরা ও বার্না বয়ের গাওয়া অফিসিয়াল সংগীত ‘দাই দাই’।

শাকিরার নাম শুনলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে অতীতের বিশ্বকাপ সংগীতের সাফল্য। কিন্তু এবারের গানটি সেই মানদণ্ডের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।

গানটির সাউন্ড ডিজাইন নিখুঁত হলেও এতে নেই প্রত্যাশিত উচ্ছ্বাস, নেই ফুটবল উৎসবের প্রাণবন্ততা। বরং পুরো ট্র্যাকটি অনেকটাই নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন মনে হয়। এমন একটি গান, যা শোনার কিছুক্ষণ পরেই শ্রোতার স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেতে পারে।

অ্যালবামের আরেকটি আলোচিত গান ‘লাইটার’, যা গেয়েছেন জেলি রোল ও কারিন লিওন।

গানটিতে কান্ট্রি-পপ ঘরানার স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। তবে এর উপস্থাপনা এতটাই পরিশীলিত এবং বাণিজ্যিক যে তা অনেক সময় স্বাভাবিকতার অনুভূতি হারিয়ে ফেলে।

গানটির সাউন্ড শুনলে মনে হয় এটি কোনো বড় করপোরেট বিজ্ঞাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে বাজারকেন্দ্রিক পরিকল্পনার ছাপ বেশি দৃশ্যমান।

বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের আবেগ ধারণ করার বদলে গানটি একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রতিনিধিত্ব করে বলেই মনে হয়।

বিশ্বকাপের গান সাধারণত মানুষকে উদ্দীপ্ত করে, দলগত আবেগ তৈরি করে এবং খেলার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু এই অ্যালবামের বড় দুর্বলতা হলো, অধিকাংশ গান সেই আবেগ জাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।

গানগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি, নিখুঁত মিক্সিং এবং উচ্চমানের প্রযোজনা থাকলেও সেগুলোতে হৃদয়ের স্পর্শ খুব কম অনুভূত হয়। অনেক ট্র্যাক একই ধরনের সাউন্ডে আবদ্ধ থাকায় বৈচিত্র্যের অভাবও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ফলে প্রায় এক ঘণ্টার এই অ্যালবাম শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ এবং একঘেয়ে অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

ফিফা বিশ্বকাপের মতো একটি আয়োজনের অফিসিয়াল অ্যালবাম থেকে ভক্তদের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। তারা এমন গান চান, যা মাঠের উত্তেজনা, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং ফুটবলের অনন্য আবেগকে একসঙ্গে তুলে ধরবে।

২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল অ্যালবাম সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা অনেকটাই বাণিজ্যিক ফর্মুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে।

‘অফিশিয়াল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ অ্যালবাম’ তারকাবহুল শিল্পী তালিকা এবং আধুনিক প্রযোজনার কারণে প্রথম নজরে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। তবে গভীরভাবে শুনলে বোঝা যায়, এটি মূলত অতিরিক্ত প্রডিউস করা ইলেকট্রো-পপ ও হিপ-হপ ট্র্যাকের একটি সংকলন, যেখানে আবেগ ও মৌলিকতার ঘাটতি স্পষ্ট।

লিসার ‘গোলস’ কিছুটা আশার আলো দেখালেও বাকি অ্যালবাম সেই মান ধরে রাখতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্মরণীয় সঙ্গীত সংযোজনের পরিবর্তে এটি হয়তো একটি দ্রুত বিস্মৃত হওয়া প্রকল্প হিসেবেই পরিচিতি পাবে।

ফুটবলপ্রেমীরা মাঠে যতটা উত্তেজনা খুঁজে পাবেন, এই অ্যালবামে তার খুব সামান্য প্রতিফলনই খুঁজে পাওয়া যায়।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন