২০২৬-২৭ বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে রেকর্ড বরাদ্দ, কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে নতুন দিগন্ত

Share

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শুধু বিদ্যমান ভাতা কর্মসূচির সম্প্রসারণই নয়, বরং নতুন নতুন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ যুক্ত করে একটি বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। ফলে নতুন বাজেটে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ যুক্ত হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হলো জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ একজন নাগরিকের জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সরকার মনে করছে, নগদ সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি প্রণোদনা এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক কার্যক্রমকে একীভূত করা গেলে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।

নতুন বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এর আওতায় আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

এই কর্মসূচির জন্য সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।

সরকারের মতে, ফ্যামিলি কার্ডধারীরা সাধারণত একাধিক সামাজিক ভাতা একসঙ্গে পাবেন না। এর ফলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা সহজ হবে এবং একই ব্যক্তি বারবার সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমে আসবে।

কৃষি খাতকে আরও গতিশীল করতে প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে কৃষক কার্ড কর্মসূচি। আগামী অর্থবছরে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে এই উদ্যোগের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিটি কৃষক বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। এ খাতে ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, ডিজিটাল কৃষক ডাটাবেইস তৈরি হলে ভবিষ্যতে সার, বীজ, ভর্তুকি, কৃষিঋণ ও প্রণোদনা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সবচেয়ে বড় অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম বয়স্ক ভাতা। বর্তমানে ৬১ লাখ ব্যক্তি মাসে ৬৫০ টাকা করে ভাতা পান। আগামী অর্থবছরে উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়ে ৬২ লাখ হবে এবং ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হবে।

একইভাবে বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের মাসিক ভাতাও ৬৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৩০ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচিতেও বড় পরিবর্তন আসছে। উপকারভোগীর সংখ্যা ৩৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৮ লাখ করা হবে। মাসিক ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৃত্তিপ্রাপ্তির সংখ্যা ৮১ হাজার থেকে ১ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাবৃত্তির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।

প্রথমবারের মতো দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য বৃহৎ পরিসরে সম্মানী কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে।

এই কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৬ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইমাম, পুরোহিত ও বিহার অধ্যক্ষরা মাসিক ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন, সেবাইত ও বিহার উপাধ্যক্ষরা ৩ হাজার টাকা এবং খাদেমরা ২ হাজার টাকা করে সম্মানী পাবেন।

এছাড়া ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হবে। সরকারের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কম আয়ে জীবনযাপন করা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সহায়তা উদ্যোগ।

নতুন বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও শহীদ পরিবারগুলো।

মোট ১৬ হাজার ৫১৩ জনকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শহীদ পরিবার এবং ‘এ’ শ্রেণির আহতরা প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা পাবেন। ‘বি’ শ্রেণির আহতরা ১৫ হাজার টাকা এবং ‘সি’ শ্রেণির আহতরা ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা পাবেন।

এই কর্মসূচিতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় হবে প্রায় ২৩৭ কোটি টাকা।

সরকার খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির আওতাও সম্প্রসারণ করছে। ভিজিএফ কর্মসূচিতে ১৫ লাখ উপকারভোগীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিধিও বাড়ানো হবে।

কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য নতুন সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ১৫ হাজার শ্রমিককে মাসে ৫ হাজার টাকা করে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হবে।

এছাড়া খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

স্বাস্থ্য খাতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, থ্যালাসেমিয়া, জন্মগত হৃদরোগ এবং স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এককালীন চিকিৎসা সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হচ্ছে।

উপকারভোগীর সংখ্যাও ৬০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬৫ হাজার করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমাতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন ধরে ভুল উপকারভোগী নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দ্বৈত সুবিধাভোগীর অভিযোগ রয়েছে।

এসব সমস্যা দূর করতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি চালু করা হবে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর)’।

এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের তথ্য সংরক্ষণ, যাচাই এবং বিশ্লেষণ করা হবে। ফলে প্রকৃত দরিদ্রদের শনাক্ত করা সহজ হবে এবং সরকারি অর্থের অপচয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তাদের মতে, এত বড় পরিসরের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকর রাখতে হলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামাজিক নিরাপত্তা খাতে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বর্ধিত ভাতা, স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরছে।

তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহের ওপর। যদি ঘোষিত কর্মসূচিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন