জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার রামরামপুর সীমান্তে এক বৃদ্ধকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টাকে কেন্দ্র করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে সীমান্ত এলাকায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। এক পর্যায়ে দুই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয় এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজিবি সূত্র জানায়, বুধবার (১০ জুন) সকাল ৬টার দিকে ভারতের নন্দীরচর সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। বিষয়টি জানতে পেরে জামালপুর ৩৫ বিজিবির সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাদের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
বিএসএফ সদস্যরা ওই বৃদ্ধকে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালালেও বিজিবি এবং স্থানীয় জনগণের বাধার মুখে তা সফল হয়নি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বৃদ্ধ ব্যক্তি সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন।
এ সময় সীমান্ত এলাকায় বিপুল সংখ্যক স্থানীয় মানুষ জড়ো হন। অনেকেই লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে অবস্থান নেন এবং অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। বিজিবিও স্থানীয়দের সহযোগিতায় সীমান্তে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জামালপুর ৩৫ বিজিবির সহকারী পরিচালক এবং নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্পের একজন পরিদর্শক নেতৃত্ব দেন।
বৈঠকে উভয় পক্ষ ওই ব্যক্তির পরিচয় এবং নাগরিকত্ব নিয়ে আলোচনা করলেও কোনো সমাধান বের হয়নি। বাংলাদেশ ও ভারত—দুই পক্ষই ওই ব্যক্তিকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে দীর্ঘ আলোচনার পরও তাকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
শেষ পর্যন্ত বিএসএফ ওই ব্যক্তিকে ফিরিয়ে নিতে রাজি না হয়ে শূন্যরেখায় রেখেই নিজেদের অবস্থানে ফিরে যায়।
পতাকা বৈঠক চলাকালে দুই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এক পর্যায়ে বিএসএফের একজন সদস্য গুলি করার হুমকিসূচক মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বিজিবি সদস্যরা।
তখন বিজিবির পক্ষ থেকে কঠোর ভাষায় বলা হয়, “আপনি কেন গুলি করার কথা বললেন? গুলি কি শুধু আপনাদের কাছেই আছে? আপনারা গুলি করলে আমরা কি চুপচাপ বসে থাকবো? আমাদের কি গুলি নেই? আমরা কি চুড়ি পরে বসে থাকবো?”
বিজিবির এই দৃঢ় অবস্থানের পর সীমান্তে উপস্থিত বাংলাদেশিরাও উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানান। তারা লাঠিসোঁটা হাতে বিএসএফকে সতর্কবার্তা দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে বিএসএফ সদস্যরা সেখান থেকে সরে যান।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে এই সীমান্ত দিয়ে একাধিকবার বাংলাদেশে মানুষ পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। বুধবারের ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করছেন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা।
পতাকা বৈঠকের পরও বিএসএফ কয়েক দফায় ওই বৃদ্ধকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে প্রতিবারই বিজিবি ও স্থানীয়দের দৃঢ় অবস্থানের কারণে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
এর ফলে সারাদিন সীমান্ত এলাকায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করে। স্থানীয় বাসিন্দারা সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, কয়েকদিন ধরেই বিএসএফ এই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বুধবার সকালে এক ব্যক্তিকে শূন্যরেখায় ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে বিজিবি এবং স্থানীয় জনগণ মিলে তা প্রতিরোধ করে।
তিনি জানান, বিষয়টি সমাধানের জন্য পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। তবে সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইন ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জামালপুরের রামরামপুর সীমান্তে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা নতুন করে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পুশইন ইস্যুকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এবং শূন্যরেখায় একজন ব্যক্তির অনিশ্চিত অবস্থান স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ঘটনা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। অন্যথায় সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তা উভয় দেশের জন্যই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
বর্তমানে ওই ব্যক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে এবং দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয় কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে সীমান্তবাসীসহ সংশ্লিষ্ট মহলের।

