ফেব্রুয়ারির মর্মান্তিক ঘটনাও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বড় আঘাত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে: প্রধানমন্ত্রী

Share

আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। তবে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাহিনী ঐক্যবদ্ধ থেকেছে এবং দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির মর্মান্তিক ঘটনাও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বুধবার (১০ জুন) ঢাকার সেনানিবাসে অবস্থিত সেনাকুঞ্জে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শান্তিরক্ষী সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী শুধু নিরাপত্তার রক্ষক নয়, বরং স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সেনাবাহিনীর অবদান জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর একজন মেজর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা জাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই গৌরবময় ঐতিহ্য দেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বিভিন্ন সময়ে দেশি-বিদেশি নানা মহল সশস্ত্র বাহিনীকে কেন্দ্র করে অপতৎপরতা চালিয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা।

তিনি আরও বলেন, নানা প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হলেও সশস্ত্র বাহিনী কখনও তাদের পেশাদারিত্ব থেকে বিচ্যুত হয়নি। বরং ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধের মাধ্যমে তারা প্রতিটি সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে স্মরণ করে বলেন, ওই ঘটনা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি গভীর ক্ষত এবং বড় ধরনের আঘাত ছিল। এমন পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে পেশাদারিত্ব, ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ডের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদানের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম প্রতিষ্ঠার পেছনে শান্তিরক্ষীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সংঘাত, যুদ্ধ এবং মানবিক সংকটপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করা সহজ কাজ নয়। প্রতিকূল পরিবেশ, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিষ্ঠা, সাহস ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী তাদের এই আত্মত্যাগ ও মানবিক দায়িত্ববোধের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পরিবার-পরিজন থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও দেশের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে শান্তিরক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের দুই লাখেরও বেশি সদস্য বিশ্বের ৪৩টি দেশের প্রায় ৬৩টি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত ১০টি শান্তিরক্ষা মিশনে প্রায় ৫ হাজার ৮৬০ জন বাংলাদেশি সদস্য কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া হাইতিতে নতুন একটি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতিও চলছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা তাদের কর্মদক্ষতা, সততা এবং মানবিক মূল্যবোধের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছেন।

নারী সদস্যদের অবদানের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের মোট সদস্যের প্রায় ১১ শতাংশ নারী।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সংকটপূর্ণ এলাকায় নারী শান্তিরক্ষীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের উপস্থিতি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ, মানবিক সহায়তা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব এবং নিষ্ঠার কারণে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় চার দশক ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আস্থা, নির্ভরযোগ্যতা এবং দক্ষতার প্রতীক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই অর্জন শুধু বাহিনীর নয়, পুরো জাতির জন্য গর্বের বিষয়।

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী শান্তিরক্ষী সদস্যদের প্রতি শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, দেশের মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং দেশপ্রেম বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন