বাংলাদেশের বাজারে বহুল পরিচিত ‘মিনিকেট’ চালের প্রকৃত উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, নওগাঁ অঞ্চলে উৎপাদিত জনপ্রিয় ‘জিরা ধান’-এর চালই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘মিনিকেট’ নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। যদিও বাস্তবে বাংলাদেশে ‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধানের জাত নেই।
নওগাঁর কৃষক, ধান ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জিরা ধান থেকে উৎপাদিত চিকন ও উন্নতমানের চালকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্যাকেটজাত করে ‘মিনিকেট’ নামে বিক্রি করা হয়। বাজারে এই নামের ব্যাপক পরিচিতি থাকায় ব্যবসায়ীরা এটিকেই ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ধানের দানা দেখতে অনেকটা মসলা জিরার মতো চিকন ও লম্বাটে হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘জিরা ধান’। নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় এই ধানের ব্যাপক চাষ হয় এবং অন্যান্য ধানের তুলনায় এর বাজারমূল্যও বেশি।
মান্দা উপজেলার কৃষক আবদুল জলিল জানান, জিরা ধানের দানা অত্যন্ত চিকন ও লম্বা হওয়ায় এটি সহজেই আলাদা করা যায়। এ ধানের চালের ভাত সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বেশি। ফলে কৃষকরা লাভের আশায় জিরা ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
আরেক কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ২০ মণ পর্যন্ত জিরা ধান উৎপাদন হয়। ভালো দাম এবং নিশ্চিত বাজার থাকায় তারা এই ধান চাষকে বেশি গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি ব্রি-২৫, ব্রি-৫৬ ও ব্রি-৭৫ জাতের ধানও চাষ করা হলেও সেগুলোর বাজারচাহিদা তুলনামূলক কম।
নওগাঁর অন্যতম বৃহৎ ধানবাজার সাবাইহাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটজুড়ে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হচ্ছে জিরা ধান। ক্রেতাদের আগ্রহও এই ধানকে ঘিরেই বেশি।
বর্তমানে প্রতি মণ (৪০ কেজি) জিরা ধান ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ব্রি-২৫, ব্রি-৫৬ ও ব্রি-৭৫ জাতের ধানের দাম প্রতি মণ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ জিরা ধানের দাম অন্যান্য জাতের তুলনায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি।
হাটের পাইকারি ব্যবসায়ী আনসার আলী বলেন, কোরবানির ঈদের পর প্রথম হাটেই জিরা ধানের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে এর চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে। তিনি দাবি করেন, “মিনিকেট নামে কোনো ধান উৎপাদন হয় না। মূলত জিরা ধানের চালই পরে মিনিকেট নামে বিক্রি করা হয়।”
চালকল মালিকদের বক্তব্যেও একই তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় চালকল মালিক হুমায়ুন কবির জানান, জিরা ধান থেকে উৎপাদিত চাল স্বাভাবিকভাবেই চিকন, সরু এবং উন্নতমানের হয়। তবে দেশের বড় শহরগুলোতে ‘মিনিকেট’ নামের ব্যাপক পরিচিতি থাকায় ব্যবসায়িক কারণে এই চালকে সেই নামেই বাজারজাত করা হয়।
তিনি বলেন, “ক্রেতারা মিনিকেট নামেই চাল খোঁজেন। তাই জিরা ধানের চাল আকর্ষণীয় প্যাকেটে ভরে মিনিকেট নামে বিক্রি করা হয়।”
চালকল মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁ অঞ্চলে উৎপাদিত জিরা ধানের চাল প্রতিদিন শত শত ট্রাকে করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে দেশের অসংখ্য ভোক্তা যে চাল ‘মিনিকেট’ নামে কিনছেন, তার বড় একটি অংশের উৎস নওগাঁর জিরা ধান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মিনিকেট’ মূলত কোনো ধানের জাত নয়, বরং এটি একটি বাজারজাতকরণ নাম। আর সেই নামের আড়ালে নওগাঁর জিরা ধানের চালই দেশের চালবাজারে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

