প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১০০ দিন: প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি যেসব বড় চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার

Share

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এই স্বল্প সময়েই সরকার বেশ কিছু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা, শিক্ষা খাতে নতুন সুবিধা এবং ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য ভাতা চালুর মতো পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

তবে এই ১০০ দিন শুধু সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, স্বাস্থ্য খাতে উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা ইস্যুতে সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে যেমন প্রশংসা হয়েছে, তেমনি সমালোচনাও কম হয়নি।

ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার জনগণের কাছে দেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কার্যক্রম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিম্নআয়ের পরিবার ও কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিতে এসব উদ্যোগকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ ছাড়া ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক ভাতা চালু করায় ধর্মীয় মহলে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ এবং দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রণোদনা শিক্ষাখাতে সরকারের অগ্রাধিকারকে সামনে এনেছে।

মেয়েদের স্নাতক পর্যায়ে বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ চালুর ঘোষণাও আলোচনায় আসে। পাশাপাশি খাল খনন ও পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের উদ্যোগ কৃষি ও পরিবেশ খাতে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

যদিও সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে বেশ কিছু বড় সংকট সামনে চলে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সংকট মোকাবিলাই ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বিশেষ করে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি, ঋণের চাপ, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং বাজারে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতাও সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব এসে পড়ে দেশের জ্বালানি খাতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে থাকায় দেশে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। প্রথমদিকে সরকার জ্বালানির দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে দাম বাড়াতে বাধ্য হয়।

গত ১৮ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলে এর প্রভাব দ্রুত পরিবহন, শিল্প ও নিত্যপণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর বিদ্যুৎ খাতেও চাপ বাড়তে থাকে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিলে ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।

উদ্যোক্তাদের দাবি, কাঁচামাল, পরিবহন ও উৎপাদন খরচ আগেই বেড়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে ছোট ও মাঝারি শিল্প বড় সংকটে পড়বে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করায় নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। গরমের মৌসুমে বিদ্যুৎ বিভ্রাট জনজীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

ঞ্জ ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণ। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকলেও অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং সরবরাহ চেইনে অনিয়ম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

সরকার বাজার মনিটরিং জোরদারের ঘোষণা দিলেও এখনো পর্যন্ত সাধারণ মানুষ তেমন স্বস্তি পায়নি।

গত ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, সহিংসতা এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে ধর্ষণ ও নারী সহিংসতার ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিরোধী দলগুলো সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে সমালোচনা করেছে।

যদিও সরকার বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় রয়েছে এবং অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবুও জনমনে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

স্বাস্থ্য খাতে হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনা সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে। স্বাস্থ্যসেবার মান ও টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

এদিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন ও অস্থিরতা দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া এবং প্রশাসনিক সংকটের কারণে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে টেকসই সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, মাত্র ১০০ দিনে তারা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কাজ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, সরকার জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করছে। তবে একটি মহল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সরকারের দাবি, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে এবং ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, সরকার এখনো দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে পারেনি। তার মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট আগের মতোই রয়েছে এবং জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতি দেখা যায়নি।

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা এখনো বড় উদ্বেগের জায়গা। তবে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারকে আরও সময় দেওয়া যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

সরকারের প্রথম ১০০ দিন ছিল মূলত পরীক্ষার সময়। এই সময়ের অভিজ্ঞতা বলে দিচ্ছে, সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, জ্বালানি, কর্মসংস্থান এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সফল হলে সরকার রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে যেতে পারে। তাই আগামী দিনগুলোতে সরকার কতটা বাস্তবমুখী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন