ইরানে নতুন বিল: ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার দাম ঘোষণা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

Share

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনার পারদ চড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahuকে হত্যাকারীর জন্য বিপুল অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে Iran। দেশটির পার্লামেন্টে এমন একটি বিল উত্থাপনের খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

ইরানের পার্লামেন্টে আলোচনাধীন নতুন বিল অনুযায়ী, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে হত্যাকারীকে ৫ কোটি ইউরো পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭১৪ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাব অনুযায়ী এটি প্রায় ৫ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।

এই বিলের খসড়া তৈরি করছে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন। কমিশনের চেয়ারম্যান Ebrahim Azizi জানান, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা পদক্ষেপ’ শীর্ষক আইনি কাঠামোর অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

খামেনির মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করছে ইরান

ইরানের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei নিহত হন। এই হামলার পেছনে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল Brad Cooper জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছে তেহরান।

ইব্রাহিম আজিজি বলেন, এই হামলার জন্য দায়ীদের ‘মুখোমুখি প্রতিক্রিয়া’ ও ‘পাল্টা জবাবের’ সম্মুখীন হতে হবে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, ভবিষ্যতে ইরানের ওপর নতুন কোনো হামলা হলে তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর এবং বিধ্বংসী।

ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই এই বিল নিয়ে পার্লামেন্টে ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। যদি বিলটি পাস হয়, তবে এটি হবে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশের আইনসভায় বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের হত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক পুরস্কার অনুমোদনের নজির।

এতদিন পর্যন্ত ইরানের ভেতরে এ ধরনের বক্তব্য মূলত ধর্মীয় ফতোয়া, রাজনৈতিক হুমকি বা ব্যক্তিগত মতামতের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার সেটি আইনি কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার চেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও অর্থ সংগ্রহের খবর সামনে এসেছে। ‘ব্লাড কভেন্যান্ট’ নামের একটি তহবিল ইতোমধ্যে ট্রাম্পকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

যদিও এই তহবিলের প্রকৃত কার্যক্রম এবং অর্থের উৎস নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো আন্তর্জাতিক যাচাই সামনে আসেনি, তবুও বিষয়টি নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন প্রচারণা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে উসকে দিতে পারে।

এই ঘটনার মধ্যেই মার্কিন সংবাদমাধ্যম Axios জানিয়েছে, ইরান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, প্রস্তাবটি আগের অবস্থানের তুলনায় খুব বেশি পরিবর্তিত নয়।

তিনি মন্তব্য করেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কার্যকর আলোচনা না হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক দিকে যেতে পারে। এমনকি কূটনৈতিক ভাষার পরিবর্তে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিতও দেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব, অন্যদিকে হত্যার পুরস্কার ঘোষণা—এই দ্বৈত অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

এর আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি ইরান তাঁর বিরুদ্ধে প্রাণনাশের কোনো চেষ্টা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠিন সামরিক পদক্ষেপ নেবে।

ট্রাম্পের ভাষায়, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার’ মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হবে না। তাঁর এই মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গাজা যুদ্ধ, পারমাণবিক ইস্যু এবং আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বের মধ্যেই এখন যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রনেতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকির বিষয়টি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই বিল বাস্তবায়নের দিকে এগোয়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বর্তমানে পুরো বিশ্ব নজর রাখছে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ইরানের পার্লামেন্টে বিলটি আদৌ পাস হবে কি না, কিংবা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার পিছু হটবে কি না—তা নিয়েই চলছে আলোচনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন