পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের স্বর্ণের বাজারে আবারও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন। এক লাফে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়ানো হয়েছে, ফলে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা। ঈদের আগে এমন আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ ক্রেতা, স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার (২৫ মে) সকালে বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে নতুন এ মূল্যতালিকার তথ্য জানানো হয়। সংগঠনটি জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে পাকা স্বর্ণ বা তেজাবি স্বর্ণের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে নতুন করে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। নতুন এই দাম সোমবার সকাল ১০টা থেকেই সারা দেশে কার্যকর হয়েছে।
বাজুসের সর্বশেষ নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, প্রতি ভরি বা ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ বিক্রি হবে ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৩১ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ কিনতে খরচ হবে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৭ টাকা। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৯ টাকা।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদকে ঘিরে সাধারণত বাজারে গয়নার চাহিদা বেড়ে যায়। সেই সময় দাম বাড়লে ক্রেতাদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুম এবং ঈদ একসঙ্গে থাকায় এবার স্বর্ণের বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।
মাত্র দুই দিন আগেই অর্থাৎ ২৩ মে স্বর্ণের দাম কমিয়েছিল বাজুস। তখন প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমে দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৩ টাকায়। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। দুই দিনের ব্যবধানে একই অঙ্কে আবারও দাম বাড়ানো হলো।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ওঠানামা এবং ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে দেশের বাজারেও দ্রুত প্রভাব পড়ছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বারবার মূল্য সমন্বয়ের ঘটনা ঘটছে।
চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে মোট ৬৯ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ৩২ বার কমানো হয়েছে। এত ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তনের কারণে ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালেও স্বর্ণের বাজার ছিল বেশ অস্থির। ওই বছর মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয় এবং ২৯ বার কমানো হয়েছিল। অর্থাৎ গত দুই বছর ধরেই দেশের স্বর্ণের বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তার কারণে স্বর্ণের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও।
শুধু স্বর্ণ নয়, একই সঙ্গে দেশের বাজারে রুপার দামও বাড়িয়েছে বাজুস। নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ১১৭ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৭৪ টাকা।
এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৫৪০ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হবে ৪ হাজার ৭২৪ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৫৫৮ টাকা।
রুপার বাজারেও চলতি বছর ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মোট ৪০ বার রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ১৮ বার কমানো হয়েছে। অথচ ২০২৫ সালে পুরো বছরে রুপার দাম সমন্বয় হয়েছিল মাত্র ১৩ বার।
ঈদুল আজহা সামনে রেখে স্বর্ণ ও রুপার দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ক্রেতারা। অনেকেই ঈদ উপলক্ষে নতুন গয়না কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকের বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে স্বর্ণের অলংকার।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরাও বলছেন, দাম বাড়লে বিক্রি কিছুটা কমে যায়। কারণ সাধারণ ক্রেতারা তখন অপেক্ষা করতে শুরু করেন। আবার অনেক বিনিয়োগকারী দাম আরও বাড়তে পারে আশঙ্কায় আগেভাগেই স্বর্ণ কিনে রাখছেন।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। যখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যায়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ করা হয় না। তবে বৈশ্বিক মূল্য, আমদানি ব্যয়, স্থানীয় সরবরাহ এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাজুস নিয়মিত মূল্য সমন্বয় করে থাকে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ঈদের সময় চাহিদা বেশি থাকায় স্বল্প সময়ের মধ্যে আবারও নতুন মূল্য ঘোষণা আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে ক্রেতাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ সামান্য সময়ের ব্যবধানে বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তন এখন স্বর্ণের বাজারে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

