নন্দীগ্রাম ছাড়লেও মানুষের পাশে থাকবেন শুভেন্দু! ভাই সৌমেন্দুর হাতে দিলেন বিশেষ দায়িত্ব

Share

নন্দীগ্রামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনও দিন শেষ হবে না। বিধায়ক পদ ছাড়লেও মানুষের পাশে আগের মতোই থাকবেন তিনি। রবিবার নন্দীগ্রামে আয়োজিত অভিনন্দন সভা থেকে এমনই আবেগঘন বার্তা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী Suvendu Adhikari। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, নন্দীগ্রামের পঞ্চায়েত, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের কাজ দেখভালের জন্য বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তাঁর ভাই তথা বিজেপি সাংসদ Soumendu Adhikari-কে।

সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সংবিধানের নিয়ম মেনেই তাঁকে একটি আসন ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু নন্দীগ্রামের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কোনও বদল হবে না। তাঁর কথায়, “আমি আগের মতোই আপনাদের কাছে পৌঁছে যাব। নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”

নন্দীগ্রামের মানুষের প্রতি আবেগঘন বার্তা

বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর— দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু। পরে ভবানীপুর কেন্দ্রের বিধায়ক হিসাবেই শপথ নেন তিনি। ফলে নন্দীগ্রাম আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাঁকে।

তবে বিদায়ী ভাষণে তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন, নন্দীগ্রামের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রাজনৈতিক সীমার বাইরে। ২০০৩ সাল থেকে এলাকার মানুষ তাঁকে যে ভাবে দেখেছেন, ভবিষ্যতেও ঠিক একই ভাবে পাশে পাবেন বলেই আশ্বাস দেন তিনি।

শুভেন্দুর কথায়, “নন্দীগ্রামের মানুষ আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন, যে বিশ্বাস রেখেছেন, সেই ঋণ আমি কোনও দিন ভুলব না।”

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর প্রসঙ্গও তুললেন শুভেন্দু

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রাম ছিল গোটা দেশের নজরে। কারণ এই কেন্দ্র থেকেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee-কে হারিয়ে রাজনৈতিকভাবে বড় বার্তা দিয়েছিলেন শুভেন্দু। তিনি সেই প্রসঙ্গও তুলে ধরেন সভায়।

তিনি বলেন, “আপনারা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আমাকে জিতিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়েছিলেন— সেই বিশ্বাসের মর্যাদা আমি রাখব।”

প্রসঙ্গত, সেই নির্বাচনে প্রায় ১,৯৫৬ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু। সেই জয় এখনও বিজেপি শিবিরে অন্যতম বড় রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়।

আটকে থাকা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এগোনোর আশ্বাস

সভা থেকে উন্নয়ন নিয়েও একাধিক প্রতিশ্রুতি দেন শুভেন্দু। তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারের আমলে নন্দীগ্রামের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আটকে রাখা হয়েছিল।

তাঁর দাবি, এলাকায় জল প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পাইপলাইন বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। একই ভাবে রেল প্রকল্পও জমি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে আটকে ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শুভেন্দু বলেন, “প্রচারে যে কথা দিয়েছিলাম, সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। কোনও অসুবিধা হবে না।”

তিনি আরও জানান, ১০০ দিনের কাজের সুবিধাও দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ নিয়ে পঞ্চায়েতমন্ত্রীর সঙ্গে ইতিমধ্যেই কথা বলেছেন বলেও জানান তিনি।

নন্দীগ্রামের দায়িত্বে সৌমেন্দু অধিকারী

রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের কারণে সব সময় নন্দীগ্রামে থাকা সম্ভব হবে না বলেও স্বীকার করেন শুভেন্দু। তাই এলাকার সার্বিক দায়িত্ব নিজের ভাই সৌমেন্দুর হাতে তুলে দেন তিনি।

সভা থেকে তিনি ঘোষণা করেন, নন্দীগ্রামের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কাজ সৌমেন্দুর নেতৃত্বেই এগোবে। তাঁকে সহযোগিতা করবেন পাঁচ জন বিধায়ক।

এই তালিকায় রয়েছেন অরূপকুমার দাস, শান্তনু প্রামাণিক, চন্দ্রশেখর মণ্ডল, নির্মল খাঁড়া এবং তপন মাইতি।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ঘোষণা থেকেই স্পষ্ট যে নন্দীগ্রামে নিজেদের সংগঠন আরও শক্তিশালী করতে চাইছে বিজেপি।

বিজেপি কর্মীদের উপর ‘নির্যাতন’ প্রসঙ্গে সরব শুভেন্দু

ভাষণের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গ। শুভেন্দু অভিযোগ করেন, বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা করা হয়েছে।

তাঁর দাবি, প্রায় ৪,০০০ বিজেপি কর্মীকে ভুয়ো মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তবে তিনি কর্মীদের উদ্দেশে শান্ত থাকার বার্তাও দেন।

শুভেন্দু বলেন, “যা করার আইনি পথেই করব। হাতে আইন তুলে নেবেন না।”

তিনি আরও দাবি করেন, যারা হিংসার সঙ্গে যুক্ত ছিল, ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহতদের পরিবারের সদস্যেরাও। তাঁদের উদ্দেশে সহমর্মিতার বার্তাও দেন শুভেন্দু।

উপনির্বাচনে বিজেপিকে জেতানোর আহ্বান

নন্দীগ্রাম আসন ছাড়ার ফলে সেখানে উপনির্বাচন হবে বলেও জানান শুভেন্দু। সেই নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীকে বিপুল ভোটে জেতানোর আবেদন জানান তিনি।

সভা থেকে তিনি বলেন, “ফলতার মতো ব্যবধান করে দেবেন তো?”

এর পাশাপাশি বিরোধীদের কটাক্ষ করতেও শোনা যায় তাঁকে। দুর্নীতি ও চুরির অভিযোগ তুলে কয়েক জন নেতার নামও উল্লেখ করেন শুভেন্দু।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষণ শুধু বিদায়ী বার্তা ছিল না, বরং নন্দীগ্রামে বিজেপির ভবিষ্যৎ রণকৌশলেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে।

নন্দীগ্রামে কি আরও শক্তিশালী হবে বিজেপি?

শুভেন্দুর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে সংগঠন, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গ। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিধায়ক পদ ছাড়লেও নন্দীগ্রামের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব কমছে না।

বরং সৌমেন্দুকে সামনে রেখে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে বিজেপি আগামী উপনির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

এখন দেখার, শুভেন্দুর এই আবেগঘন বার্তা ও সাংগঠনিক রদবদল নন্দীগ্রামের ভোট রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন