ইরান-মার্কিন চুক্তি ঘিরে নতুন মোড়: হরমুজ় প্রণালী, ট্রাম্পের সতর্ক বার্তা ও পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা

Share

পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ইরান ও আমেরিকার সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। কয়েক দিন আগেও যখন মনে হচ্ছিল বহু প্রতীক্ষিত এই সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, তখনই নতুন করে সতর্কতার বার্তা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে কোনও রকম তাড়াহুড়ো করা হবে না। বরং সময় নিয়ে, ভুল এড়িয়ে, প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে দেখে তবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এই অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন তাৎপর্য তৈরি করেছে। কারণ, মাত্র এক দিন আগেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে চুক্তি “প্রায় চূড়ান্ত” এবং খুব শীঘ্রই তা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর অবস্থানে এই সতর্ক সুর কূটনৈতিক মহলে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

ইরান চুক্তি নিয়ে কেন সতর্ক ট্রাম্প?

রবিবার নিজের সমাজমাধ্যম পোস্টে ট্রাম্প জানান, মার্কিন কূটনৈতিক প্রতিনিধিদলকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন কোনও অবস্থাতেই তাড়াহুড়ো না করা হয়। তাঁর মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এখন আমেরিকার অনুকূলে রয়েছে। সেই কারণেই চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে, ধাপে ধাপে নিখুঁত ভাবে এগোতে চায় ওয়াশিংটন।

ট্রাম্পের বক্তব্য, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি “পেশাদার” এবং “গঠনমূলক” হয়ে উঠছে। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে এত বড় কূটনৈতিক সমঝোতায় সামান্য ভুলও ভবিষ্যতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত চুক্তি ঘোষণা করার চেয়ে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করাই তাঁর অগ্রাধিকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান মূলত আন্তর্জাতিক চাপ, তেলবাজারের অনিশ্চয়তা এবং হরমুজ় প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বকে মাথায় রেখেই নেওয়া হয়েছে।

হরমুজ় প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হল হরমুজ় প্রণালী। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রফতানির বড় অংশ এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে ইরান ওই প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন দেশের জাহাজ চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে আমেরিকাও ইরানে যাতায়াতকারী জাহাজগুলির উপর নিষেধাজ্ঞা এবং নজরদারি বাড়িয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শনিবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির অংশ হিসাবেই হরমুজ় প্রণালী আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু রবিবার তিনি নতুন বার্তায় জানান, চুক্তি আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বহাল থাকবে।

তাঁর কথায়, “দু’পক্ষকেই পর্যাপ্ত সময় নিতে হবে। সব কিছু নিখুঁত ভাবে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনও শিথিলতা নয়।”

এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, আমেরিকা এখনও ইরানের উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে প্রস্তুত নয়।

ইরান-আমেরিকা সংঘাতের পটভূমি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথবাহিনী ইরানে সামরিক অভিযান চালায়। সেই হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা Ali Khamenei।

এই ঘটনার পরই পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ভয়াবহ আকার নেয়। ইরান পাল্টা জবাব হিসেবে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার মিত্র দেশগুলিকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। একাধিক সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থানে হামলার খবর সামনে আসে।

যদিও বর্তমানে সংঘর্ষবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবু পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সীমান্তে উত্তেজনা এখনও বজায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলও আশঙ্কা করছে, সামান্য উস্কানিতেই ফের বড় সংঘাত শুরু হতে পারে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও ব্যর্থ আলোচনা

দুই দেশের সংঘাত থামাতে একাধিক দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়েছে। বিশেষ করে Pakistan গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করে। ইসলামাবাদে আলোচনায়ও বসেছিল দুই পক্ষ। কিন্তু সেই বৈঠক থেকেও কোনও কার্যকর সমাধান বেরিয়ে আসেনি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্প্রতি তেহরান সফরে যান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান Asim Munir। তাঁর সফর ঘিরে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হলেও এখনও পর্যন্ত স্থায়ী সমঝোতার ইঙ্গিত মেলেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ দিনের অবিশ্বাস এতটাই গভীর যে শুধুমাত্র মধ্যস্থতায় দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।

ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন জল্পনা

শনিবার ট্রাম্পের একটি পোস্ট আন্তর্জাতিক মহলে আশার সঞ্চার করেছিল। সেখানে তিনি দাবি করেন, শান্তিচুক্তির আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে এবং কয়েকটি বিষয় চূড়ান্ত হলেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে।

তিনি আরও জানান, চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে হরমুজ় প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল।

এমনকি ভারতে সফররত মার্কিন বিদেশসচিব Marco Rubio-ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গোটা বিশ্ব একটি সুখবর পেতে চলেছে।”

এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জল্পনা শুরু হয় যে ইরান-আমেরিকা চুক্তির ঘোষণা হয়তো খুব কাছেই। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন অবস্থান সেই সম্ভাবনাকে আপাতত ধীর করে দিল।

বিশ্ব রাজনীতি ও তেলবাজারে প্রভাব

ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ক শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ে গোটা বিশ্ব রাজনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি বাজারে।

বিশেষ করে হরমুজ় প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের নজর এখন ওয়াশিংটনের দিকেই।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প একদিকে কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে তিনি এমন একটি চুক্তি করতে চান যা ভবিষ্যতে আমেরিকার কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিষ্কার যে ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। যদিও দুই পক্ষই আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি, তবু আস্থার সংকট এখনও বড় বাধা।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বার্তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকা এখন আর দ্রুত কোনও ঘোষণা দিতে আগ্রহী নয়। বরং তারা দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের দিকেই জোর দিচ্ছে।

বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে— সত্যিই কি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে ঐতিহাসিক সমঝোতা হবে, নাকি নতুন করে উত্তেজনা আরও বাড়বে? আগামী কয়েক দিনই সেই উত্তর দেবে।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন