৩০ পেরোতেই হার্টের যত্নে সতর্ক হোন! এই ৫ অভ্যাস না বদলালে বাড়বে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি

Share

একসময় মনে করা হত হৃদ্‌রোগ মানেই বয়সজনিত সমস্যা। ষাট বা সত্তরের পরেই হার্টের অসুখ দেখা দেয়— এমন ধারণাই ছিল অধিকাংশ মানুষের। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ৩০ কিংবা ৪০ বছর বয়সেও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। চিকিৎসকদের মতে, আধুনিক জীবনযাপন, মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের অভাব এবং শরীরচর্চা না করার প্রবণতাই এর বড় কারণ।

অনেকেই ভাবেন, এখন একটু অনিয়ম করলেও পরে গিয়ে সব ঠিক করে নেবেন। কিন্তু হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি ধীরে ধীরে ভিতর থেকে শুরু হয়। বাইরে থেকে সুস্থ দেখালেও শরীরের ভিতরে নীরবে বাড়তে থাকে ঝুঁকি। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, হার্ট সুস্থ রাখতে হলে ৩০ বছর বয়সের পর থেকেই কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করা জরুরি।

কেন কম বয়সেই বাড়ছে হৃদ্‌রোগ?

আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানুষ নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার সময় পাচ্ছেন না। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ, ফাস্ট ফুডের প্রতি ঝোঁক, কম ঘুম, ধূমপান এবং উদ্বেগ— সব মিলিয়ে হৃদ্‌যন্ত্রের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

চিকিৎসকদের মতে, হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখতে শুধু ওষুধ নয়, জীবনযাত্রার পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস বদলাতে পারলেই অনেক বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।

১. ধূমপান ছাড়ুন, হার্টকে বাঁচান

সিগারেট, ভেপ কিংবা অন্য যে কোনও ধরনের তামাকজাত দ্রব্য হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অনেকেই মনে করেন ধূমপান শুধু ফুসফুসের ক্ষতি করে। কিন্তু বাস্তবে এটি রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

ধূমপানের ফলে রক্ত ঘন হয়ে যেতে পারে, রক্তচাপ বাড়ে এবং হার্টে রক্ত চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধূমপান করলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

চিকিৎসকেরা বলছেন, ধূমপান ছাড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই হৃদ্‌যন্ত্রের উপর চাপ কমতে শুরু করে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই অভ্যাস ত্যাগ করাই ভাল।

২. সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন

আজকাল ব্যস্ত জীবনে প্রক্রিয়াজাত খাবার, ঠান্ডা পানীয়, অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার অনেকের রোজকার সঙ্গী। কিন্তু এই ধরনের খাবার ধীরে ধীরে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ট্রান্স ফ্যাট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তনালিতে চর্বি জমতে শুরু করে, যা হার্টের জন্য বিপজ্জনক।

হার্ট সুস্থ রাখতে নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে—

  • শাকসব্জি
  • ফলমূল
  • দানাশস্য
  • বাদাম
  • কম তেলযুক্ত খাবার
  • পর্যাপ্ত পানি

পুষ্টিবিদদের মতে, বাড়ির রান্না করা সহজপাচ্য খাবার হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য সবচেয়ে উপকারী।

৩. নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন

উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ অনেক সময় শরীরে কোনও লক্ষণ না দেখা দিলেও ভিতরে ভিতরে হার্টের ক্ষতি হতে থাকে।

৩০ বছর বয়সের পর নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা ধরা পড়লে জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমেই তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃদ্‌যন্ত্রকে বেশি চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়। এর ফলে হার্ট অ্যাটাক, কিডনির সমস্যা এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।

বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

৪. পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বিপদ বাড়বে

অনেকেই কাজের চাপে রাত জাগেন বা পর্যাপ্ত ঘুমকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু কম ঘুমের সরাসরি প্রভাব পড়ে হৃদ্‌যন্ত্রের উপর।

চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের সময় শরীর নিজেকে মেরামত করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে রক্তচাপ বাড়ে এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমোনো প্রয়োজন। শুধু সময় নয়, ঘুমের গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং মোবাইল বা ল্যাপটপের ব্যবহার কমালে ঘুম ভাল হয়।

৫. শরীরচর্চা ছাড়া সুস্থ হার্ট সম্ভব নয়

শুধু সপ্তাহে একদিন জিমে গেলেই হবে না। প্রতিদিন শরীরকে সক্রিয় রাখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত হাঁটা, দৌড়, সাঁতার, সাইকেল চালানো বা যোগাসন হৃদ্‌যন্ত্রকে শক্তিশালী রাখে। শরীরচর্চা করলে রক্ত সঞ্চালন ভাল হয় এবং শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি কমে।

হার্টের জন্য বিশেষভাবে উপকারী অ্যারোবিক ব্যায়াম। পাশাপাশি পেশি ও হাড় মজবুত রাখতে রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিংও প্রয়োজন।

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মানসিক চাপও হার্টের বড় শত্রু

বর্তমান সময়ে মানসিক চাপও হৃদ্‌রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। কাজের চাপ, আর্থিক দুশ্চিন্তা, সম্পর্কের সমস্যা— সব কিছুর প্রভাব পড়ে হৃদ্‌যন্ত্রের উপর।

স্ট্রেস বাড়লে শরীরে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোন বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে হার্টের ক্ষতি করতে পারে।

তাই শুধু শরীর নয়, মনকেও সুস্থ রাখা জরুরি। মেডিটেশন, গান শোনা, বই পড়া বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

এখন থেকেই সতর্ক হওয়া জরুরি

চিকিৎসকদের মতে, হার্টের যত্ন নেওয়ার জন্য বার্ধক্যের অপেক্ষা করলে চলবে না। কারণ হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি অনেক সময় ধীরে ধীরে হয় এবং তা প্রথম দিকে বোঝা যায় না।

তাই ৩০ বছর বয়স পার হওয়ার পর থেকেই জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ধূমপান ছাড়া, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা— এই কয়েকটি অভ্যাসই দীর্ঘদিন হার্টকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে।

সুস্থ হৃদ্‌যন্ত্র মানেই শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, বরং প্রাণবন্ত এবং কর্মক্ষম জীবনও।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন