গরমে বাড়ছে ‘স্টমাক ফ্লু’-র সংক্রমণ! হাসপাতালে রোগীর ভিড়, কী থেকে ছড়াচ্ছে পেটের অসুখ?

Share

অসহ্য গরমে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। তার উপর নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে পেটের সংক্রমণ। শহর থেকে জেলা— হাসপাতালগুলিতে বাড়ছে বমি, ডায়েরিয়া, পেট ব্যথা এবং জ্বরের রোগী। শুধু শিশু নয়, আক্রান্ত হচ্ছেন বড়রাও। চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে ‘স্টমাক ফ্লু’ বা ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ বা আইসিএমআর জানিয়েছে, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন ভাইরাস এবং ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। ফলে খাবার এবং জল থেকেই মূলত বাড়ছে এই অসুখের প্রকোপ।

কী এই ‘স্টমাক ফ্লু’?

ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস-কেই সাধারণ ভাবে ‘স্টমাক ফ্লু’ বলা হয়। এই রোগে মূলত পাকস্থলী এবং অন্ত্রে সংক্রমণ দেখা দেয়। ফলে বমি, পাতলা পায়খানা, পেট মোচড়ানো ব্যথা, দুর্বলতা এবং জ্বরের মতো সমস্যা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি।

কোন ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া ছড়াচ্ছে এই অসুখ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৪৫ ডিগ্রির মধ্যে পৌঁছলে নানা ধরনের জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করে। বিশেষ করে খাবার এবং জলে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এই সময়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছে—

  • নোরোভাইরাস সংক্রমণ
  • রোটাভাইরাস সংক্রমণ
  • সালমোনেল্লা ব্যাক্টেরিয়া
  • ই কোলাই ব্যাক্টেরিয়া

এই জীবাণুগুলিই মূলত খাবারে বিষক্রিয়া এবং পেটের সংক্রমণের জন্য দায়ী।

কেন গরমে এত দ্রুত খাবার নষ্ট হয়?

চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরম এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকলে রান্না করা খাবার খুব দ্রুত পচে যায়। অনেক সময় ফ্রিজে রাখা খাবারেও ব্যাক্টেরিয়া জন্মাতে পারে।

ফলে কয়েক ঘণ্টা বাইরে রাখা খাবার খেলেই পেটের গোলমাল শুরু হতে পারে। বিশেষ করে রাস্তার খাবার, কাটা ফল, লস্যি বা ফলের রস থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

কী কী লক্ষণ দেখা যাচ্ছে?

চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার জানিয়েছেন, বর্তমানে জ্বরের সঙ্গে পেটের সমস্যাও ব্যাপক হারে দেখা যাচ্ছে।

সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • বমি
  • ডায়েরিয়া
  • পেট ব্যথা
  • জ্বর
  • দুর্বলতা
  • শরীরে জলশূন্যতা
  • খাওয়ার ইচ্ছা কমে যাওয়া

অনেকের ক্ষেত্রে সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ীও হচ্ছে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে এই অসুখ সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশুদের দ্রুত জলশূন্যতা দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া যাঁদের—

  • ডায়াবিটিস রয়েছে
  • কিডনির সমস্যা রয়েছে
  • ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম

তাঁদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে।

কী ভাবে সতর্ক থাকবেন?

গরমে পেটের অসুখ এড়াতে কিছু নিয়ম মেনে চলা খুব জরুরি।

১. বেশি করে জল খান

গরমে শরীর থেকে প্রচুর জল বেরিয়ে যায়। ফলে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়ে। তাই পর্যাপ্ত জল খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে—

  • ওআরএস
  • নুন-চিনির শরবত
  • ডাবের জল
  • ঘরে তৈরি ডিটক্স পানীয়

নিয়মিত খেলে শরীর সুস্থ থাকবে।

শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্যই ফুটিয়ে ঠান্ডা করা জল খাওয়াতে হবে।

২. বাসি খাবার এড়িয়ে চলুন

রান্না করা খাবার বেশি ক্ষণ বাইরে ফেলে রাখবেন না। খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার ভাল করে গরম করে তবেই খান।

চিকিৎসকদের মতে, ফ্রিজে রাখা পুরনো খাবার থেকেও ব্যাক্টেরিয়া ছড়াতে পারে। তাই বাসি খাবার না খাওয়াই ভাল।

৩. রাস্তার খাবার থেকে দূরে থাকুন

এই সময়ে রাস্তার ধারে বিক্রি হওয়া—

  • কাটা ফল
  • ফলের রস
  • লস্যি
  • ঠান্ডা পানীয়
  • জাঙ্ক ফুড

এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কারণ গরমে এগুলি খুব দ্রুত দূষিত হয়ে যেতে পারে।

৪. সকালে খালি পেটে চা-কফি নয়

অনেকেরই সকালে খালি পেটে চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, গরমে এই অভ্যাস পেটের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষ করে অতিরিক্ত ব্ল্যাক কফি খেলেও অ্যাসিডিটি এবং পেটের গোলমাল বাড়তে পারে।

৫. হালকা ও ঘরোয়া খাবার খান

গরমে কম তেলে রান্না করা হালকা খাবার খাওয়াই সবচেয়ে ভাল।

যেমন—

  • ভাত
  • ডাল
  • সেদ্ধ সবজি
  • টক দই
  • ফল

এই ধরনের খাবার সহজে হজম হয় এবং শরীরও ঠান্ডা রাখে।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন