ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অভিবাসন নীতি: গ্রিন কার্ড পেতে নিজ দেশে ফেরার বাধ্যবাধকতা

Share

যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী ভিসায় অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য গ্রিন কার্ড আবেদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যারা সাময়িক ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পেতে চান, তাদের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। এই সিদ্ধান্তকে অভিবাসন ব্যবস্থার কড়াকড়ি আরও বাড়ানোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে—যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ অভিবাসন কাঠামোকে শক্তিশালী এবং স্বচ্ছ করতেই এই নতুন নীতিমালা কার্যকর করা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক ব্যক্তি ভিসা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন এবং সেখান থেকেই স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। নতুন নীতির মাধ্যমে সেই সুযোগ সীমিত করা হবে।

গ্রিন কার্ড আবেদনে কঠোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অস্থায়ী ভিসাধারীরা যদি গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে চান, তাহলে তাদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সংস্থাটি বলেছে, এই নীতি অভিবাসন আইনের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করবে এবং অনিয়মের সুযোগ কমাবে।

ডিএইচএসের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে প্রবেশের উদ্দেশ্য শেষ হলে বিদেশি নাগরিকদের দেশত্যাগ করার কথা। কিন্তু অনেকেই দীর্ঘ সময় অবস্থান করে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করেন, যা বর্তমান প্রশাসনের মতে অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার।

শুক্রবার (২২ মে) ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) নতুন একটি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ কোনও স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। বরং এটি সরকারের বিবেচনার ভিত্তিতে দেওয়া একটি বিশেষ সুবিধা।

সংস্থাটি জানায়, অভিবাসন ব্যবস্থার মূল কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে অস্থায়ী ভিসাধারীরা তাদের নির্ধারিত কাজ বা উদ্দেশ্য শেষ হওয়ার পর নিজ দেশে ফিরে যাবেন বলে ধরে নেওয়া হয়। তাই স্থায়ী বসবাসের আবেদন এখন আরও কঠোর যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যাবে।

নতুন নীতিমালার আওতায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ভিসার শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে কি না
  • অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করা হয়েছে কি না
  • অননুমোদিত চাকরি বা কর্মসংস্থানে যুক্ত থাকার অভিযোগ
  • কোনও ধরনের জালিয়াতি বা তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না
  • যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় দেওয়া শর্তগুলো মানা হয়েছে কি না

অর্থাৎ, এখন থেকে আবেদনকারীদের অতীত কার্যক্রম ও ভিসা ব্যবহারের পুরো ইতিহাস আরও গভীরভাবে যাচাই করা হবে।

তবে ইউএসসিআইএস কিছু ব্যতিক্রমের কথাও উল্লেখ করেছে। কিছু নির্দিষ্ট ভিসা ক্যাটাগরিকে ‘দ্বৈত উদ্দেশ্য’ বা Dual Intent Visa হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধরনের ভিসাধারীরা আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করার পাশাপাশি স্থায়ী বসবাসের আবেদনও করতে পারেন।

তবে সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, এই বিশেষ সুবিধা থাকলেও গ্রিন কার্ড পাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা নেই। প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আবেদনকারীর যোগ্যতা, আইন মেনে চলা এবং অভিবাসন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিবেচনা করে।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, নতুন এই নীতির ফলে অন্যান্য অভিবাসন মামলার নিষ্পত্তি আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে। কারণ অনেক আবেদন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থেকেই করা হতো, যা দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করত। এখন আবেদনকারীদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে হলে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সরকারি সম্পদের অপচয় কমবে বলে মনে করছে প্রশাসন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কঠোর অভিবাসন নীতিরই ধারাবাহিকতা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসনের পথ আরও নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, নতুন নিয়মের কারণে বহু মানুষ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন।

সংগঠনগুলো বলছে, অনেক আবেদনকারী এমন দেশ থেকে এসেছেন যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা বা নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। তাদেরকে আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এছাড়া বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, চাকরি করছেন এবং পরিবার গড়ে তুলেছেন। নতুন নীতির ফলে তাদের পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে। বিশেষ করে যারা অস্থায়ী ভিসায় গিয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাদের জন্য এই নীতি বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের অভিবাসন নীতির দিকনির্দেশনাও প্রকাশ করছে। বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ, ভিসার শর্ত কঠোরভাবে মানা এবং নির্ধারিত সময় শেষে দেশত্যাগ—এসব বিষয়ে প্রশাসন এখন আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

নতুন নিয়ম কার্যকর হলে শিক্ষার্থী, পর্যটক, অস্থায়ী কর্মীসহ বিভিন্ন ধরনের ভিসাধারীরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে পারেন। কারণ আগে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই গ্রিন কার্ডের আবেদন করতেন। এখন তাদেরকে আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য নিজ দেশে ফিরে যেতে হতে পারে।

ফলে আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে, ব্যয় বাড়তে পারে এবং অনেকের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যাদের পরিবার বা চাকরি যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে এই নতুন কড়াকড়ি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই নীতি বাস্তবায়নের ফলে কতটা পরিবর্তন আসে এবং ভবিষ্যতে আরও কী ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন