চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরকে কোনোভাবেই সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু কিংবা অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠতে দেওয়া হবে না বলে দৃঢ় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গড়ে ওঠা অপরাধী নেটওয়ার্ক ও সন্ত্রাসী আধিপত্য ভেঙে দিতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
শনিবার (৩১ মে) জঙ্গল সলিমপুর এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন শেষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালকসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তারা এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং চলমান আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভেতরে একটি অপরাধভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। জঙ্গল সলিমপুর সেই অপতৎপরতার একটি বড় উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে এখানে কিছু অসাধু গোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষের জীবনকে অনিরাপদ করে তুলেছিল।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। জঙ্গল সলিমপুরেও সেই নীতির অংশ হিসেবে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, অপরাধী চক্রগুলো এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং এক ধরনের সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। এর মাধ্যমে তারা এলাকার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করত।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানের ফলে সেই অবৈধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। র্যাব, পুলিশ, বিজিবি এবং অন্যান্য বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে অপরাধীদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁসের কারণে অভিযানের সব লক্ষ্য শতভাগ অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্প ভাঙচুরের ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাকে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও আইনশৃঙ্খলার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, কারা পেছন থেকে উসকানি দিয়েছে এবং কোন ভূমিদস্যু গোষ্ঠী এতে সম্পৃক্ত ছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
জঙ্গল সলিমপুরে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রকৃত বাসিন্দাদের নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমানে সেখানে বসবাসরত কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা নেই। বরং প্রকৃত অধিবাসীদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে, যাতে তাদের জীবনমান উন্নত হয় এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা যায়।
সরকার জঙ্গল সলিমপুরকে একটি পরিকল্পিত ও নিরাপদ এলাকায় রূপান্তরের লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এলাকায় আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম আরও সহজ করবে।
এছাড়া পুলিশ, বিজিবি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ বিষয়ে কাজ করছে এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারের এই পদক্ষেপ চট্টগ্রামের নগর পরিকল্পনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, জঙ্গল সলিমপুরকে আর কোনোভাবেই অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেওয়া হবে না। সন্ত্রাস, ভূমিদস্যুতা এবং অবৈধ প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান আরও জোরদার হবে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করে এলাকাটিকে একটি সুশৃঙ্খল ও আধুনিক জনপদে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘদিনের অপরাধভিত্তিক কাঠামোর অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে।

