সর্বোচ্চ রিজার্ভের পথে বাংলাদেশ, লক্ষ্য ৫১ বিলিয়ন ডলার

Share

বাংলাদেশ আবারও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নতুন রেকর্ড গড়ার স্বপ্ন দেখছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জিত হলে ২০২১ সালের সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ভেঙে দেশের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভ বৃদ্ধির এ লক্ষ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে রেমিট্যান্স, রপ্তানি, বৈদেশিক সহায়তা এবং বিনিয়োগের ওপর। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের গতি ধরে রাখাও হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

করোনা মহামারির সময় আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ায় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণে বাড়ায় ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

তবে পরবর্তীতে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের উল্লম্ফনের কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমে যায়। কয়েক বছরের মধ্যে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এখন সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে রিজার্ভ পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা যায়। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভিন্ন পদ্ধতিতে রিজার্ভ হিসাব করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভের হিসাবে স্বর্ণ, এসডিআর, বৈদেশিক বন্ড, ট্রেজারি বিল ও বিভিন্ন তহবিল অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে আইএমএফের বিএপিএম-৬ পদ্ধতিতে শুধু সহজে ব্যবহারযোগ্য ও তরল বৈদেশিক সম্পদ গণনা করা হয়।

সর্বশেষ ২৩ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। তবে আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী তা ছিল ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। সরকারের ৫১ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য মূলত গ্রস রিজার্ভের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে।

রিজার্ভ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। চলতি মে মাসের প্রথম ২৩ দিনেই দেশে এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে ২৩ মে পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারভিত্তিক ডলার বিনিময় হার, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো সহজ হওয়া এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কারণে রেমিট্যান্সে এ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮৯ হাজার ৮৭০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় বেশি।

মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য শ্রমবাজারে কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী বছরগুলোতেও রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকার আশা করা হচ্ছে।

একসময় বাজারে ডলারের সংকট মোকাবিলায় রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।

গত ২৩ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ৬ কোটি ডলার কিনেছে। শুধু মে মাসেই মোট ডলার ক্রয় হয়েছে ৬২৫ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরে ডলার ক্রয়ের পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় এবং রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু রিজার্ভ বাড়ানোই অর্থনীতির একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের মতে, বিনিয়োগ বাড়লে মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও শিল্পপণ্যের আমদানি বাড়বে। ফলে ডলারের চাহিদাও বাড়বে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে। তাই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তবে একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে রিজার্ভ ধরে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার আমদানি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ এবং রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

রিজার্ভ বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নও বড় ভূমিকা রাখবে। সরকার বর্তমানে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। চুক্তি হলে আগামী অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেট সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

এছাড়া বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও কয়েক বিলিয়ন ডলার সহায়তা আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সরাসরি রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে রপ্তানি আয় কমতে পারে। শ্রমবাজার সংকুচিত হলে রেমিট্যান্সেও প্রভাব পড়বে।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বাড়তে পারে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় অঙ্কের রিজার্ভ থাকলেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না। প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সক্ষমতা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর।

তবে রেমিট্যান্স, রপ্তানি, বৈদেশিক সহায়তা এবং বিনিয়োগ—এই চার খাত যদি একসঙ্গে শক্তিশালী থাকে, তাহলে বাংলাদেশ শুধু ৫১ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভের লক্ষ্য অর্জনই করবে না, বরং আরও স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তিও গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন