আওয়ামী লীগ আবারও নির্বাচনে ফিরতে পারে, ইঙ্গিত দিলেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন

Share

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং দেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই দলটি অংশ নিতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বহুল আলোচিত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। তার বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতিশক্তি খুব দীর্ঘ নয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলে যায়। সেই কারণেই আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ফিরে আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে কোনো দল চরম সংকটে পড়লেও পরে আবার জনসমর্থন ফিরে পেয়েছে। তাই আওয়ামী লীগকে একেবারে শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করার সুযোগ নেই। আগামী নির্বাচনেই দলটি অংশ নেবে—এমন সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেননি তিনি।

এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের রাজনীতিতে সামনে বড় ধরনের সমীকরণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে সাবেক এই উপদেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের নানা অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, দায়িত্ব পালনকালে অন্তত তিনবার পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।

তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়, ওই সময় তার পদত্যাগ সরকারের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।

তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরেও নানা ধরনের চাপ ও মতবিরোধ ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সরকারের ভেতরের পরিস্থিতি কতটা জটিল ছিল, তারও একটি আভাস মিলেছে তার কথায়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তি বা তথাকথিত ‘ডিপস্টেট’-এর ভূমিকা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, পৃথিবীর প্রায় সব বড় ঘটনার পেছনেই কোনো না কোনোভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠীর প্রভাব থাকে।

তবে তারা কখনো সরাসরি স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নেয় না। বরং পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য সুযোগ কাজে লাগায় এবং বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

তার এই মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে অদৃশ্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও বাড়বে।

সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল সরকারের ভেতরে কথিত ‘কিচেন কেবিনেট’ নিয়ে তার বক্তব্য। তৌহিদ হোসেন জানান, এক বিশেষ উপলক্ষে তাকে এমন একটি বৈঠকে অংশ নিতে হয়েছিল।

পরে তিনি জানতে পারেন, সরকারের ভেতরে প্রভাবশালী একটি গোপন বলয় নিয়মিত বৈঠক করত। প্রতি মঙ্গলবার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও বলেন, পর্দার আড়ালে থেকে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—এমন গুঞ্জন আগেও তার কানে এসেছিল। তবে পরে বাস্তবেও এমন কার্যক্রমের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ভোটের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়েও কথা বলেন তৌহিদ হোসেন।

তিনি স্পষ্টভাবে জানান, পুরো প্রক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। বরং বিষয়টি দেখভাল করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।

তার মতে, এর পেছনে হয়তো বিশেষ কোনো চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে পরিস্থিতি যদি এতটা জটিল না হতো, তাহলে চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই বেশি যৌক্তিক হতো।

এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলেও মনে করছেন অনেকে।

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা-কে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে পাঠানো চিঠি নিয়েও কথা বলেন সাবেক এই উপদেষ্টা।

তিনি জানান, চিঠি পাঠানো হলেও ভারত ইতিবাচক সাড়া দেবে—এমন প্রত্যাশা তার ছিল না। বরং শুরু থেকেই তিনি জানতেন, দিল্লি এ বিষয়ে নীরব থাকতে পারে।

চিঠির জবাব না আসা প্রসঙ্গে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, “আমরা কি সত্যিই কোনো উত্তরের আশা করেছিলাম?”

তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে বাস্তবসম্মত ধারণাই ছিল সরকারের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

তৌহিদ হোসেনের এই সাক্ষাৎকার দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের ক্ষমতার বলয়, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে তার মন্তব্য এখন রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামনে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে। একই সঙ্গে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের যে ধারাবাহিকতা চলছে, তাতে আগামী নির্বাচন হতে পারে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন | তথ্য সূত্র: ইত্তেফাক

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন