গরমে বাইরে বেরোনোই এখন যেন একপ্রকার চ্যালেঞ্জ। দেশের বহু জায়গায় তাপমাত্রা এতটাই বেড়েছে যে কয়েক মিনিট রোদে থাকলেই মাথা ঘোরা, ক্লান্তি কিংবা জলশূন্যতার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকেরাও পরামর্শ দিচ্ছেন যতটা সম্ভব সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলতে। কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে আর এক সমস্যা— শরীরে কমে যাচ্ছে ভিটামিন ডি-র মাত্রা।
কারণ, ভিটামিন ডি-র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল সূর্যের আলো। অথচ ভয়াবহ গরমে সেই রোদ থেকেই দূরে থাকতে হচ্ছে। ফলে অনেকেই চিন্তায় পড়েছেন, তা হলে শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি মিলবে কী ভাবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রোদে দাঁড়ালেই হবে না, সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে সূর্যালোক গ্রহণ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এত জরুরি ভিটামিন ডি?
ভিটামিন ডি আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রো-হরমোন, যা শরীরে ক্যালশিয়াম এবং ফসফরাস শোষণে সাহায্য করে। এর ফলে হাড় মজবুত থাকে এবং দাঁতের স্বাস্থ্যও ভাল থাকে।
তবে শুধু হাড়ের জন্যই নয়, এই ভিটামিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, পেশির কার্যকারিতা ঠিক রাখতে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। শরীরে দীর্ঘদিন ভিটামিন ডি-র ঘাটতি থাকলে দুর্বলতা, হাড়ে ব্যথা, ক্লান্তি এমনকি অবসাদের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
গরমে কোন সময়ে রোদে দাঁড়ানো সবচেয়ে ভাল?
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অভীক শীল জানিয়েছেন, খুব ভোরের নরম রোদে অনেক সময় পর্যাপ্ত ইউভি বি রশ্মি পাওয়া যায় না। অথচ এই ইউভি বি রশ্মিই শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি করতে সাহায্য করে।
তাঁর মতে, সকাল একটু গড়ালে সূর্যের অতিবেগনি বি রশ্মি বেশি সক্রিয় হয়। তবে দুপুরের প্রচণ্ড রোদ আবার শরীরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই এর মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, গরমকালে সাধারণত সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে কিছু ক্ষণ রোদে থাকা তুলনামূলক নিরাপদ। এই সময়ে রোদ যথেষ্ট কার্যকর থাকে, আবার তাপমাত্রাও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছয় না।
কেন সকালে খুব ভোরের রোদে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি মেলে না?
চিকিৎসকদের মতে, এর পিছনে রয়েছে “সোলার জ়েনিথ অ্যাঙ্গল”-এর প্রভাব। খুব সকালে সূর্যের অবস্থানের কারণে ইউভি বি রশ্মি সরাসরি ত্বকে পৌঁছতে পারে না। তার উপর বায়ুদূষণও অনেক ক্ষেত্রে এই রশ্মির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
এ ছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ বাইরে বেরোনোর আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সানস্ক্রিন প্রায় ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ ইউভি বি রশ্মি শোষণ করে নেয়। ফলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়াও কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
কত ক্ষণ রোদে থাকবেন?
সব মানুষের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ত্বকের রং, বয়স, কোথায় থাকেন এবং কতটা সূর্যালোক পাচ্ছেন— এই সব বিষয়ের উপর নির্ভর করে শরীরে কত দ্রুত ভিটামিন ডি তৈরি হবে।
চিকিৎসকদের মতে—
- যাঁদের গায়ের রং তুলনামূলক গাঢ়, তাঁদের প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট রোদে থাকা প্রয়োজন হতে পারে।
- যাঁদের ত্বক অপেক্ষাকৃত ফর্সা, তাঁদের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ মিনিটও যথেষ্ট হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে সরাসরি রোদে না থাকাই ভাল। কারণ এই সময়ে হিটস্ট্রোক, ত্বক পুড়ে যাওয়া এবং জলশূন্যতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
শুধু রোদ নয়, খাবার থেকেও মিলতে পারে ভিটামিন ডি
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ পুষ্পিতা মণ্ডল জানিয়েছেন, যাঁদের শরীরে ভিটামিন ডি-র মাত্রা খুব কম, তাঁদের শুধুমাত্র সূর্যালোকের উপর নির্ভর না করাই ভাল।
তিনি বলছেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এমন কিছু খাবার রাখা উচিত যেগুলি প্রাকৃতিক ভাবে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ।
যেমন—
- ডিমের কুসুম
- চর্বিযুক্ত মাছ
- ফর্টিফায়েড দুধ
- ফর্টিফায়েড দানাশস্য
- কড লিভার অয়েল
- মাশরুম
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাবার থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। তাই প্রয়োজন হলে রক্তপরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্টও খেতে হতে পারে।
ভিটামিন ডি-র ঘাটতির লক্ষণ কী?
অনেক সময় শরীরে ভিটামিন ডি কমে গেলেও মানুষ তা বুঝতে পারেন না। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে—
- সব সময় ক্লান্ত লাগা
- হাড় বা পেশিতে ব্যথা
- দুর্বলতা
- মন খারাপ বা অবসাদ
- ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া
এই ধরনের সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

