দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান বিএনপি নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। জামায়াত নেতা ও সংসদ সদস্য আমির হামজা-এর একটি ওয়াজ মাহফিলের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
রোববার (২৪ মে) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক আবেগঘন স্ট্যাটাসে রাশেদ খাঁন দাবি করেন, ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে জনমনে বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এতে উগ্র সমর্থক গোষ্ঠী যেকোনো সময় তার ওপর হামলা চালাতে পারে।
ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন অভিযোগ করেন, এমপি আমির হামজা ওয়াজ মাহফিলে এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে উস্কে দিতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তাকে সাধারণ মানুষের কাছে “হত্যাযোগ্য ব্যক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকতেই পারে, কিন্তু ধর্মীয় মঞ্চ ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ সাধারণ মানুষ ধর্মীয় বক্তাদের কথা অনেক সময় আবেগ দিয়ে গ্রহণ করে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
রাশেদ খাঁন স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে যদি তার কোনো ধরনের শারীরিক ক্ষতি হয়, তাহলে এর সম্পূর্ণ দায় আমির হামজাকেই নিতে হবে। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্ট্যাটাসে রাশেদ খাঁন আমির হামজার অতীত রাজনৈতিক অবস্থানেরও সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, অতীতে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে দাঁড়িয়ে আমির হামজা নিজেকে এবং তার পরিবারকে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।
রাশেদ খাঁনের ভাষ্যমতে, সেই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর উন্নয়ন ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের পক্ষে বক্তব্যও দিয়েছিলেন আমির হামজা। এমনকি শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ না করলে যেকোনো দলের নেতাকর্মীই “জাহান্নামে যাবে” বলেও মন্তব্য করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর আমির হামজা নিজের অবস্থান পাল্টে ফেলেছেন। আর সেই পুরোনো বক্তব্যগুলো টেলিভিশন টকশো ও বিভিন্ন আলোচনায় তুলে ধরার কারণেই তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন জামায়াতের এই নেতা।
রাশেদ খাঁন বলেন, রাজনৈতিক মঞ্চে সমালোচনা হলে তিনি সেটিকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতেন। কারণ রাজনীতিতে মতবিরোধ স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু ওয়াজ মাহফিলের মতো ধর্মীয় পরিবেশে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা তার নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার দাবি, ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে জনমনে ক্ষোভ তৈরি করা হলে সেটি কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এটি সামাজিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, উস্কানিমূলক বক্তব্যের কারণে যেকোনো সময় “মব জাস্টিস” বা দলবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। আর সেটিই এখন তার সবচেয়ে বড় ভয়।
রাশেদ খাঁনের এই পোস্ট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত বলেও মন্তব্য করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় বক্তৃতা ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মিশ্রণ নতুন ধরনের উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এসব বক্তব্য খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন দেশের তরুণ রাজনীতিকদের মধ্যে একটি পরিচিত নাম। তিনি ২০১৮ সালের আলোচিত কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ছাত্রনেতা নুরুল হক নূর-এর সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
পরবর্তীতে “গণঅধিকার পরিষদ” গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং দলটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তরুণদের মধ্যে তার একটি আলাদা জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল।
তবে ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি হঠাৎ করেই গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগ দেন।
২০২৬ সালের বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন রাশেদ খাঁন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি বিজয়ী হতে পারেননি।
তারপরও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি আলোচিত মুখ হিসেবেই রয়েছেন। বিভিন্ন টকশো, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব উপস্থিতির কারণে তিনি নিয়মিত আলোচনায় থাকেন।
রাশেদ খাঁনের সাম্প্রতিক এই অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া এবং তা থেকে সহিংসতার আশঙ্কা— বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করা হলে তা সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।

