চশমা ছাড়াই স্পষ্ট দৃষ্টি! কাঞ্চন মল্লিকের চোখে নতুন আলো, কলকাতায় কী কী সার্জারি হয় জানুন

Share

চোখে মোটা কাচের চশমা অনেকের কাছেই অস্বস্তির। বিশেষ করে যাঁদের চোখের পাওয়ার খুব বেশি, তাঁদের দৈনন্দিন জীবন প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করে চশমা বা পাওয়ার লেন্সের উপর। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির হাত ধরে এখন সেই সমস্যারও সমাধান সম্ভব। লেজ়ার সার্জারির মাধ্যমে চোখের পাওয়ার অনেকটাই কমিয়ে ফেলা যায়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে চশমা ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব হচ্ছে।

এর বড় উদাহরণ অভিনেতা ও উত্তরপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিক। একসময় তাঁর ডান চোখের পাওয়ার পৌঁছে গিয়েছিল মাইনাস ১৮-তে। দৃষ্টিশক্তি প্রায় হারানোর মুখে দাঁড়িয়েও সঠিক চিকিৎসায় এখন তিনি প্রায় চশমামুক্ত জীবন কাটাচ্ছেন।

ছোটবেলা থেকেই চশমার সঙ্গে যুদ্ধ

খুব ছোট বয়স থেকেই চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা ছিল কাঞ্চনের নিত্যসঙ্গী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখের সমস্যা আরও বাড়তে থাকে। ডান চোখের পাওয়ার ধীরে ধীরে মাইনাস ১৮-তে পৌঁছয়। এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে, বাঁ চোখ বন্ধ করলেই প্রায় কিছুই দেখতে পেতেন না তিনি।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কাঞ্চন জানান, প্রথম শ্রেণিতে ওঠার আগেই তাঁর চোখে চশমা লাগে। প্রথমদিকে ডান চোখে মাইনাস ৮ এবং বাঁ চোখে মাইনাস ৩ পাওয়ার ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি আরও কমতে শুরু করে। একসময় চিকিৎসকেরা পর্যন্ত জানিয়ে দেন, তাঁর ডান চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে লেজ়ার চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেই চিকিৎসাই বদলে দেয় তাঁর জীবন।

পাওয়ার লেন্স থেকে লেজ়ার ট্রিটমেন্ট

অভিনয়ের পেশার কারণে দীর্ঘদিন পাওয়ার লেন্স ব্যবহার করতে হত কাঞ্চনকে। কারণ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের সময় মোটা চশমা সবসময় ব্যবহার করা সম্ভব হত না। তাঁর স্ত্রী শ্রীময়ী-ও জানিয়েছেন, চশমার উপর কাঞ্চনের নির্ভরতা এতটাই বেশি ছিল যে, একবার কুম্ভমেলায় স্নানের সময় চশমা জলে পড়ে গেলে তিনি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।

তবে এখন আধুনিক অস্ত্রোপচারের পর সেই পরিস্থিতি পুরো বদলে গিয়েছে। আগের মতো সবসময় চশমা পরে থাকতে হয় না তাঁকে। দৃষ্টিশক্তিও অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে।

কলকাতাতেই হচ্ছে আধুনিক চোখের সার্জারি

একসময় চোখের পাওয়ার কমানোর উন্নত অস্ত্রোপচারের জন্য মানুষকে বেঙ্গালুরু বা চেন্নাই যেতে হত। কিন্তু এখন কলকাতাতেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নানা ধরনের লেজ়ার সার্জারি হচ্ছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, রোগীর বয়স, চোখের পাওয়ার, কর্নিয়ার অবস্থা এবং চোখের অন্যান্য সমস্যার উপর নির্ভর করে ঠিক করা হয় কোন সার্জারি উপযুক্ত হবে।

ল্যাসিক সার্জারি কী?

ল্যাসিক এখন সবচেয়ে পরিচিত চোখের লেজ়ার সার্জারিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর পুরো নাম ‘লেজ়ার অ্যাসিস্টেড ইন-সিটু কেরাটোমিলিউসিস’।

এই পদ্ধতিতে কর্নিয়ার আকৃতি পরিবর্তন করে চোখের পাওয়ার কমানো হয়। কর্নিয়া হল চোখের সামনের স্বচ্ছ অংশ, যার মাধ্যমে আলো চোখের ভিতরে প্রবেশ করে। কর্নিয়ার গঠনে সমস্যা থাকলে দূরের বা কাছের জিনিস ঝাপসা দেখা যায়।

ল্যাসিক সার্জারিতে লেজ়ারের সাহায্যে কর্নিয়ার পাতলা স্তর কেটে সেটিকে নতুন আকার দেওয়া হয়। ফলে আলো সঠিকভাবে রেটিনায় পৌঁছতে পারে এবং দৃষ্টি পরিষ্কার হয়।

ল্যাসিক সার্জারির খরচ

এই সার্জারির খরচ সাধারণত ৪৫ হাজার টাকা থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে হয়। কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পাওয়ার কতটা কমানো হচ্ছে, তার উপর খরচ নির্ভর করে।

স্মাইল প্রো সার্জারি কেন জনপ্রিয়?

বর্তমানে স্মাইল প্রো খুব দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এটি তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণাত্মক এবং নিরাপদ পদ্ধতি বলে মনে করা হয়।

এই সার্জারিতে কর্নিয়ায় বড় কাটাছেঁড়া করতে হয় না। ফলে দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়। যাঁরা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা মোবাইল স্ক্রিনের সামনে কাজ করেন, বিশেষ করে আইটি কর্মী, সাংবাদিক বা কর্পোরেট পেশার মানুষদের জন্য এটি বেশ কার্যকর।

৪০ বছরের পরেও অনেক ক্ষেত্রে স্মাইল প্রো করা সম্ভব।

স্মাইল প্রো সার্জারির খরচ

এই অস্ত্রোপচারের খরচ সাধারণত ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে।

পিআরকে সার্জারি কীভাবে কাজ করে?

পিআরকে বা ‘ফোটোরিফ্র্যাক্টিভ কেরাটেকটোমি’ হল আরেক ধরনের লেজ়ার চিকিৎসা। এখানে কর্নিয়ার বাইরের পাতলা স্তর সরিয়ে সরাসরি লেজ়ার প্রয়োগ করা হয়।

অনেক ক্ষেত্রে এটি ল্যাসিকের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত বা যাঁদের শরীরচর্চা বেশি, তাঁদের জন্য পিআরকে উপযোগী বলে মনে করা হয়।

ক্রিকেটার, ফুটবলার বা অ্যাথলিটদের ক্ষেত্রে এই সার্জারি ভাল ফল দেয়।

পিআরকে সার্জারির খরচ

এই অস্ত্রোপচারের আনুমানিক খরচ ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে।

আইসিএল সার্জারি কার জন্য?

বয়স যখন ৫০ বা তার বেশি হয়, তখন অনেক সময় লেজ়ারের বদলে আইসিএল বা ‘ইমপ্ল্যান্টেবল কলামার লেন্স’ বেশি কার্যকর হয়।

এই পদ্ধতিতে চোখের ভিতরে বিশেষ লেন্স বসানো হয়। যাঁদের ছানি রয়েছে বা ছানি হওয়ার বয়স এসেছে, তাঁদের জন্য এই প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে ভাল ফল দেয়।

উচ্চ পাওয়ারের রোগীদের ক্ষেত্রেও আইসিএল বেশ জনপ্রিয়।

আইসিএল সার্জারির খরচ

এই অস্ত্রোপচারের খরচ সাধারণত ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। লেন্সের ধরন অনুযায়ী খরচ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকাও হতে পারে।

কারা চোখের লেজ়ার সার্জারি করাতে পারবেন?

সব মানুষের চোখ এই ধরনের সার্জারির জন্য উপযুক্ত নয়। চিকিৎসকেরা কিছু নির্দিষ্ট শর্তের কথা বলেন।

১) বয়স অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি হতে হবে।
২) চোখের কর্নিয়া যথেষ্ট পুরু হতে হবে।
৩) দীর্ঘদিন ধরে পাওয়ার স্থির থাকতে হবে।
৪) চোখে সংক্রমণ বা অতিরিক্ত শুষ্কতার সমস্যা থাকলে আগে চিকিৎসা জরুরি।
৫) যাঁদের পাওয়ার বারবার বদলায়, তাঁরা সাধারণত এই সার্জারির জন্য উপযুক্ত নন।

চিকিৎসার আগে কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকবেন?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র চশমা পরতে ভাল লাগে না বলেই লেজ়ার সার্জারি করানো উচিত নয়। প্রত্যেকের চোখ আলাদা। তাই পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ছাড়া কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

ভুল জায়গায় বা অভিজ্ঞতা কম এমন প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচার করালে কর্নিয়ার জটিল সমস্যা হতে পারে। তাই ভালো হাসপাতাল ও দক্ষ চিকিৎসক বেছে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে চিকিৎসা প্রযুক্তি এতটাই উন্নত হয়েছে যে, একসময় যাঁরা সারাজীবন চশমার উপর নির্ভরশীল ছিলেন, তাঁরাও নতুন করে পরিষ্কার পৃথিবী দেখতে পাচ্ছেন। আর সেই তালিকায় এখন অন্যতম পরিচিত নাম কাঞ্চন মল্লিক।

সর্বশেষ সংবাদ

spot_imgspot_img

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন