বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সরকার শুধু পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, একইসঙ্গে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দেশের কৃষি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ রক্ষায় এই দুই প্রকল্পকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বুধবার (২০ মে) বিকেলে গাজীপুর-এ জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সামনে তিনি সরকারের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, “অনেকে রাজনৈতিকভাবে নানা ধরনের মন্তব্য করতে পারেন। তবে সরকার দেশের মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় কাজ করছে। আমরা শুধু পদ্মা ব্যারাজ নয়, তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করছি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা ও পদ্মা নদীভিত্তিক এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে অনেক এলাকায় সেচ সংকট দেখা দেয়। কৃষকরা পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় চাষাবাদে ক্ষতির মুখে পড়েন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার নদীভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন না।
তিনি আরও বলেন, “মাটির নিচে পানি কমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি শূন্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ কারণে সরকার বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।”
পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীর পানি সংরক্ষণ সহজ হবে এবং কৃষিকাজে সেচ সুবিধা বাড়বে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও কমে আসবে।
নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অনেক এলাকায় খাল ভরাট ও দখলের কারণে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ছে। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো কমানোর চেষ্টা করছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল খনন ও নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, “দেশে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে গাছপালা কমে যাচ্ছে, ফসলি জমিও নষ্ট হচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। আমাদের প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে।”
নতুন যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলায় দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি। বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, উন্নয়ন করতে গিয়ে প্রকৃতির ক্ষতি করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের সম্পদ সীমিত। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে পারলে দেশকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”
পরিবেশবিদদের মতে, টেকসই উন্নয়নের জন্য নদী, খাল, বন ও কৃষিজমি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনাও সমানভাবে প্রয়োজন।
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ধান, গম, ভুট্টা ও সবজি উৎপাদনে সেচ সুবিধা বাড়লে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। একইসঙ্গে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষি খাতে উন্নয়ন হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে সরকারের এই প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে অনেকেই দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উন্নয়নের জন্য বড় বার্তা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশের জন্য নদীভিত্তিক প্রকল্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

