হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে নতুন করে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ঘটনাটি সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং এতে একাধিক সন্দেহজনক দিক উঠে এসেছে। বিশেষ করে একই প্রতিষ্ঠানের শেডে বারবার আগুন লাগার ঘটনায় তদন্তকারীরা গভীরভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সেবা প্রতিষ্ঠান ডিএইচএলের পাঁচ কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
গত বছরের ১৮ অক্টোবর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট, সেনাবাহিনী এবং বিজিবি সদস্যরা একযোগে কাজ করেন। ওই ঘটনায় কয়েকশ কোটি টাকার পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন ব্যবসায়ীরা।
এর প্রায় আট মাস পর আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৫ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিমানবন্দরের কার্গো এলাকার ডিএইচএল শেডে আগুন লাগে। দুইবারের আগুনই একই প্রতিষ্ঠানের শেড থেকে শুরু হওয়ায় তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগুন লাগার স্থানটি ছিল সিসিটিভি ক্যামেরার সরাসরি নজরদারির বাইরে। ঘটনাস্থলের সামনেই একটি বৈদ্যুতিক পিলার ছিল এবং নিচে কিছু বৈদ্যুতিক তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল।
প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হলেও তদন্তকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, শর্ট সার্কিট হলে সাধারণত স্পার্ক সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। কিন্তু ঘটনাস্থলে এমন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বিদ্যুতের লাইটও বন্ধ হয়নি, যা শর্ট সার্কিট তত্ত্বকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলের কিছু দূরে সিগারেটের কয়েকটি অবশিষ্টাংশ খুঁজে পেয়েছেন। তবে এ বিষয়েও রয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি। কারণ বিমানবন্দরের ওই স্পর্শকাতর এলাকায় ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগারেট থেকে আগুন লাগলে প্রথমে ধোঁয়া সৃষ্টি হয় এবং পরে ধীরে ধীরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সিসিটিভি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগুনটি হঠাৎ করেই দ্রুত দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ফলে সিগারেটের কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে— এমন ধারণাও এখন প্রশ্নের মুখে।
ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। ফুটেজে দেখা যায়, আগুন লাগার স্থানসংলগ্ন এলাকায় ডিএইচএলের একজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেখানে মশারি টাঙিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
তদন্তকারীদের দাবি, আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পরও ওই ব্যক্তি প্রায় দেড় থেকে দুই মিনিট অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে কাউকে সতর্ক না করে পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর ফোন করে বিষয়টি জানান।
এই আচরণ তদন্তকারীদের মধ্যে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত থাকে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাতের ওই সময়ে ধূমপানের জন্য বা অন্য কোনো স্বাভাবিক কারণে সেখানে কারও যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে আগুন কীভাবে শুরু হলো এবং এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
তাদের ধারণা, ঘটনাটির পেছনে মানবসৃষ্ট কোনো কারণ থাকতে পারে। যদিও এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা হচ্ছে না, তবে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, ডিএইচএলের ওই কন্টেইনারে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সংরক্ষিত ছিল। এর মধ্যে ছিল কাপড়ের রোল, কাগজজাত সামগ্রী, রাবার পণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রীসহ নানা ধরনের আমদানিকৃত মালামাল।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, এসব পণ্য আগামী রোববার নিলামে তোলার কথা ছিল। কিন্তু নিলামের আগেই আগুন লাগার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানতে চাইছেন, এটি কি কেবল দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেছে?
একই শেডে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় ডিএইচএলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যদি এটি দুর্ঘটনা হয়, তাহলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। আর যদি মানবসৃষ্ট ঘটনা হয়, তাহলে সেটি আরও উদ্বেগজনক।
বিমানবন্দরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থানে একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শুক্রবারের আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিজস্ব ফায়ার ইউনিট এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তাদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
তবে আগুনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে ডিএইচএলের কয়েকজন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্য ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
তাদের আশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ফায়ার সার্ভিসও পৃথকভাবে তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই আগুন লাগার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
অন্যদিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেছেন, আগুনের উৎস এবং এর পেছনে কোনো নাশকতা রয়েছে কি না উভয় বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে তদন্তকারীদের দাবি ও বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয়ে ডিএইচএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় পরপর দুটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দেশের বিমান নিরাপত্তা ও কার্গো ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তদন্তে উঠে আসা অসঙ্গতি, সিসিটিভি ফুটেজের তথ্য, সন্দেহজনক পরিস্থিতি এবং একই প্রতিষ্ঠানের শেডে বারবার আগুন লাগার ঘটনা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন সবার নজর তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে, যা হয়তো এই রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উন্মোচন করবে।

